বর্তমান সরকার দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নজিরবিহীন দলীয়করণের মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েমের অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বহু অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোগুলোয় যোগ্য ব্যক্তিদের সরিয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নিজেদের অনুগতদের বসানো হচ্ছে। শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) সকালে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মহানগর জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক বিশাল কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। একই ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে তিনি আগামী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে জামায়াতের দলীয় মেয়র প্রার্থী হিসেবে মহানগর আমির মাওলানা আব্দুল জব্বারের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
জামায়াতের আমির তাঁর বক্তব্যের শুরুতে ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে যাঁরা বুক চিতিয়ে লড়াই করে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করেছেন, সেইসব শহীদ ও পঙ্গুত্ব বরণকারী ভাই-বোনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব ও অভূতপূর্ব ত্যাগের কারণেই ২০২৬ সালে দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছে; অন্যথায় কোনো নির্বাচনই হতো না। বর্তমান সংসদ, সরকার এবং বিরোধী দলের অবস্থান মূলত সেই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, এখন ক্ষমতায় বা বিরোধী দলে থেকে কেউ যদি শহীদ পরিবারগুলোকে অবজ্ঞা বা উপহাস করেন, তবে তা হবে সরাসরি জাতীয় গাদ্দারি। বিগত নির্বাচনে চরম ভয়ভীতি, কালো টাকার ছড়াছড়ি ও প্রশাসনিক ইঞ্জিনিয়ারিং উপেক্ষা করে ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি আসন উপহার দেওয়ায় তিনি স্থানীয় জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনের সময়কার ‘সংস্কার গণভোট’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দেশের প্রায় ৬৬.৮ শতাংশ মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। নির্বাচনের আগে জনরোষের মুখে পড়ে খোদ সরকারপ্রধানও আবু সাঈদের এলাকায় গিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, অথচ এখন সংসদে দাঁড়িয়ে ‘সর্বমন্ত্রীরা’ বলছেন যে—সেটি কেবল নির্বাচন পার করার একটি কৌশল ছিল। জামায়াত আমিরের মতে, শীর্ষ পর্যায় থেকে জনগণের সাথে এমন প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের রায়কে অবমাননা করে জোর করে একদলীয় শাসন চালাতে চাইলে দেশের মানুষ সামনে হিমালয়ের মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলবে; কারণ ইতিহাস সাক্ষী—শেখ মুজিবুর রহমানও একদলীয় শাসন কায়েম করে সাড়ে তিন বছরের বেশি টিকতে পারেননি।
অর্থনৈতিক ও স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জামায়াতের শীর্ষ এই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৫ বছরে ২৯ লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে, আর বর্তমান সরকার বড় বাজেট দিলেও মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, বরং দুর্নীতির মিটার আগের চেয়ে আরও বেড়ে গেছে। এক সময়ের শিল্পের রাজধানী ও ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ খ্যাত নারায়ণগঞ্জ আজ সন্ত্রাসের রাজধানীতে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি মেধাবী ছাত্র ত্বকীর দীর্ঘ এক যুগেও বিচার না হওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অনতিবিলম্বে দেশের সকল জেলা ও স্থানীয় সরকারে বসানো অনির্বাচিত দলীয় প্রশাসকদের সরিয়ে নির্বাচনের জোর দাবি জানান। নাসিক নির্বাচনের জন্য মাওলানা আব্দুল জব্বারের নাম ঘোষণার পাশাপাশি তিনি নারায়ণগঞ্জের ২৭টি ওয়ার্ডেই সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।



