নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালী :
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে সোয়া কিলোমিটার দুরত্বে জাতীয় উদ্যান। ওই দুরত্বের মাঝে বাঁধের ভেতরেই জেলা প্রশাসনের ডাকাবাংলো। সমুদ্র তীরের বেড়িবাঁধ ধরেই বাংলো হয়ে উদ্যানে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। তার পরেও কুয়াকাটা রক্ষাবাঁধের বাইরে পৌরসভা সরকারি অর্থে উদ্যানে যেতে আরসিসি সড়ক নির্মাণ করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সমুদ্রের ঢেউয়ের তোড় থেকে রাস্তাটি সংরক্ষনের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা রাখেননি। তাই ঢেউয়ের তোড়ে সড়কের একটা অংশ বৃহস্পতিবার ভেঙ্গে সাগরে বিলিন হয়েছে।
রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ার পর প্রাথমিক তদন্ত শেষে উপজেলা প্রশাসন বলছেন, রাস্তাটি নির্মাণের প্রাক্কলনে কোন প্রকার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এমনকি সমুদ্রের ঢেউয়ের তোড় থেকে রাস্তাটির সংরক্ষনের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা রাখেননি। তাই সড়ক নির্মানের আগেই তা সাগরে বিলিন হয়েছে।
এ ঘটনায় কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কুয়াকাটা সী-বিচ সংলগ্ন রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প যুক্তিযুক্ত ছিল কিনা? নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হয়েছে কিনা? এমন সাতটি বিষয় বিবেচনায় রেখে কমিটি তদন্তে নেমেছেন। আগামী সাত কার্যদিবসে তারা প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

কুয়াকাটা পৌরসভা সূত্র জানায়, কক্সবাজারের মেরিণ ড্রাইভের আদলে কুয়াকাটা সী-বীচ ঘীরে রাস্তাটি নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই রাস্তা ধরে পর্যাটকরা যেতে যেতে সমুদ্রের নির্মল আবহাওয়া অনুভব করবেন।
রাস্তাটির নির্মাণ কাজের দরপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্টের সী-কুইন হোটেল থেকে এক দশমিক ৩০ কিলোমিটার দুরত্বে জাতীয় উদ্যান। কুয়াকাটা পৌরসভার অধীনে থাকা এই প্রকল্পের বর্ননা অনুযায়ী, রাস্তাটি তিনটি গ্রুপে বিভক্ত করে ২০২৩ সালের নভেম্বরে দরপত্র আহবান করা হয়। ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু দরপত্র জটিলতার কারনে ২০২৪ সালের ১৩ জানুয়ারী লটারির মাধ্যমে ঠিকাদার বাছাই করা হয়। সে অনুযায়ী ১৮ জানুয়ারী ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেয়া হয়।
২০২৪ সালের ২৭ জানুয়ারী কুয়াকাটা বেড়িবাঁধের বাইরের এই রাস্তার কাজের উদ্বোধন করেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ওপটুয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিববুর রহমান মহিব। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের(পাউবো) শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে বাঁধের বাইরে রাস্তা নির্মাণ কাজ শুরু করলেও তা পাউবো থেকে কোন অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে জানান পাউবোর এক প্রকৌশলী। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তিনি বলেন, বাঁধের বাইরে স্থাপনা তৈরী অবৈধ। সেটা সরকারি কিংবা ব্যক্তি মালিকানাধীন যেটাই হোক।
তিনি জানান, উদ্বোধনের আগেই রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। পাউবোর অনুমোতি ছাড়া বাধের বাইরে সড়ক নির্মাণ শুরু করলে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তিতে প্রতিমন্ত্রী নিজেই এসে বন্ধ করে দেয়া রাস্তার কাজের উদ্বোধন করেন। বিষয়টি তখন উর্দ্ধতণ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী নিজে থেকেই উদ্বোধন করায় আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারিনি।
কুয়াকাটা সী ট্যুরিজম’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনি আলমগীর বলেন, বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে বৃহস্পতিবার দুপুরে অস্বাভাবিক জোয়ারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্র উত্তাল ছিল। সৈকতের তীরঘেঁষে নির্মিত সড়ক ও সবুজায়ন প্রকল্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়কের কিছু অংশে ধস নেমে তা মিশে গেছে সৈকতের বালুচরে। কুয়াকাটার ডিসি পার্ক সংলগ্ন সড়কের নিচের বালির স্তর সরে গিয়ে অন্তত ১০টি স্থানের আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বড় ধস নেমেছে। হাঁটার জন্য নির্মিত ফুটপাথের বহু অংশ ভেঙে পড়েছে সাগরে। পানির তোড়ে রাস্তাটির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় সড়কটিতে হাঁটাচলা করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কুয়াকাটা পৌরসভার সহকারি প্রকৌশলী নিয়াজুর রহমান বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। দরপত্র অনুযায়ী ইতোমধ্যেই অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে। সেই কাজের বিপরীতে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্টানকে বিল দেয়া হয়েছে। রাস্তাটির বাকি বিল ও জামানত সরকারি কোষাগারে জমা আছে। কোন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে, তা কাগজপত্র না ঘেটে বলতে পারবেন না।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবিউল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ ইয়াসীন সাদেককে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী, কলাপাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী, এলজিইডি কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী ও কলাপাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। এই কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
এদিকে কমিটির সদস্যরা আজ শুক্রবার সরেজমিন ভেঙে বিলীন হওয়া রাস্তাটি পরিদর্শন করেছেন। কমিটির আহবায়ক ও কুয়াকাটা পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে সহকারি কমিশনার (ভুমি) মোহাম্মদ ইয়াসীন সাদেক জানান, সড়কটির পুরো বিল পরিশোধ হয়নি। বাকি বিল ও জামানত সরকারি কোষাগারে জমা আছে। আমরা অবশ্যই ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করব। এছাড়াও কাজের মান ও সংশ্লিষ্ট কারো গাফিলতি ছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।



