লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সদ্য ঘোষিত যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর টানা বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শনিবার দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ জেলায় ১৬ জন, সিডন জেলার কানারিত এলাকায় ৭ জন এবং টায়ার জেলার বারাশি গ্রামে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। লেবাননের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা এনএনএ (NNA) নিশ্চিত করেছে, কাফর রেমান গ্রামে ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবানন সেনাবাহিনীর একজন নিয়মিত সেনাসদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন। এই আকস্মিক ও ব্যাপক সামরিক আগ্রাসনের ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির সমঝোতা স্মারক (MoU) পরবর্তী আলোচনার ভবিষ্যৎ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
লেবাননে ইসরায়েলের এই অব্যাহত হামলাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদের (Article 1) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে তেহরান। এই ধারায় লেবাননসহ সব রণক্ষেত্রে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ছিল। ইসরায়েলি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তাৎক্ষণিক ও কৌশলগত জবাব হিসেবে ইরানের সামরিক বাহিনী পারস্য উপসাগরের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz) পুনরায় সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড থেকে এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “এটি শত্রুপক্ষের চুক্তি লঙ্ঘনের জবাবে নেওয়া প্রথম পদক্ষেপ; আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে শত্রুকে অঙ্গীকার পালনে বাধ্য করতে আরও কঠোর সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই ভঙ্গুর শান্তি চুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুরু হয়েছে তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার ইতিমধ্যে প্রাথমিক আলোচনার জন্য সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনায় অংশ নিতে তিনিও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন। তবে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ এবং ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার পর, ইরানি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহুমুখী চাপের মুখে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে (IDF) লেবাননে সাময়িকভাবে ‘হামলা বন্ধ রাখার’ মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজ। হোয়াইট হাউসের সাথে জরুরি সমন্বয়ের পর এই কৌশলগত নির্দেশনা এলেও দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত প্রায় ৫ শতাংশ এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত মার্চ মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর শুরু হওয়া এই সংঘাতের ফলে লেবাননে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি বেসামরিক নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা বর্তমান এশীয় ভূ-রাজনীতিকে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।



