― Advertisement ―

মার্কিন অভিযানের জবাবে ‘বাব-এল-মান্দেব’ বন্ধের ছক তেহরানের; অর্থনীতি রক্ষায় ট্রাম্পের পিছু হটা

ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি অতি-গোপন ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযান পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে আটকে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN) প্রকাশিত এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) সদর দফতরে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ন্যাটোর বৈঠক ফেলে জরুরি ভিত্তিতে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এক আকস্মিক ব্রিফিংয়ে অংশ নেন। এই উচ্চপর্যায়ের সামরিক প্রস্তুতি স্পষ্ট করে যে, হোয়াইট হাউস ইরানে মার্কিন বুট বা স্থল সেনা নামানোর কতটা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তবে বিপুল মার্কিন সেনার হতাহতের আশঙ্কা এবং চিরস্থায়ী যুদ্ধের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে এই সামরিক অভিযান স্থগিত করেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই সামরিক পরিকল্পনার ফাইলটি যখন প্রেসিডেন্টের ডেস্কে আসে, তখন ওয়াশিংটন ও তেহরান সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আজ (১৪ জুন, ২০২৬) একটি চুক্তি সই হতে পারে। এই সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে সামরিক আগ্রাসন চালালে চলমান শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তদুপরি, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে সতর্ক করা হয়েছিল যে, মার্কিন স্থল অভিযানের জবাবে ইরান কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিলে তা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।

মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, এই মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেহরানও তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ‘পারমাণবিক বিকল্প’ (Economic Nuclear Option) প্রস্তুত করে রেখেছিল। চুক্তি ব্যর্থ হলে এবং নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজলে ইরান ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার ‘বাব-এল-মান্দেব’ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ছক কষেছিল। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যে সামান্য পথ অবশিষ্ট ছিল, তাও অবরুদ্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন মন্দা ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতো। এই ধরণের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব এবং মার্কিন নাগরিকদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবের বিষয়টি ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সর্বশেষ পরিদর্শনের ভিত্তিতে পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেহরান ইতিমধ্যে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড অস্ত্রের সমপর্যায়ের ইউরেনিয়াম গ্যাসীয় অবস্থায় ইস্পাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদোর মতো ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের গভীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মজুত করেছে। আইএইএ-র মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি সতর্ক করেছেন, এই মজুত দিয়ে ইরান অনায়াসে ১০টি পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলতে সক্ষম। পেন্টাগনের শীর্ষ কমান্ডারদের আশঙ্কা, প্রতিকূল যুদ্ধকালীন পরিবেশে মাটির গভীরে লুকানো এই গ্যাসীয় ইউরেনিয়াম নিরাপদে অপসারণ করা মার্কিন কমান্ডোদের পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ হতো। এই সামরিক জটিলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে মার্কিন অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত কূটনীতিকে সামরিক শক্তির ওপর জয়ী করেছে।