ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার উপকূলে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সাথে লড়াই করে টিকে আছেন সাহারা বেগম। স্বামী সম্পূর্ণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, সাথে রয়েছে তিন তিনটি নাবালক সন্তান। হাজিরহাট ইউনিয়নের চরফৈজুদ্দিন গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেড়িবাঁধের পাশে একটি ছোট জরাজীর্ণ ঘরে এই পাঁচ সদস্যের পরিবারের বসবাস। পুরো সংসারের অর্থনৈতিক ও মানসিক হাল একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন এই লড়াকু নারী। মানুষের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ এবং সেলাইয়ের যৎসামান্য আয়ে কোনোমতে দিনমজুরের মতো কাটছিল তাদের দিন।
তবে মাস খানেক আগে বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী ঝড় এই অসহায় পরিবারের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও কেড়ে নেয়। ঝড়ের তোড়ে তাদের জরাজীর্ণ ঘরটি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত ও ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় ঘরের চালে সামান্য কিছু পুরোনো টিন জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে দাঁড় করানো হলেও অর্থাভাবে ঘরের চারপাশের বেড়া, দরজা কিংবা জানালা কিছুই লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে উন্মুক্ত ও ভাঙাচোরা এই ঘরে অন্ধ স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে প্রতিটি রাত কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতা আর মৃত্যুভয়ে।
মনপুরার এই উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক ও হতদরিদ্র মানুষের এমন মানবেতর জীবনযাপন নতুন কিছু নয়। তবে সাহারা বেগমের এই চরম সংকটের দিনে প্রথম সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় তরুণ সমাজসেবক আবদুর রহমান সোয়েব। তিনি নিজের বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৩ হাজার টাকা সংগ্রহ করে পরিবারটির হাতে তুলে দেন। এই অর্থ দিয়ে প্রাথমিক কিছু কাজ শুরু করা হলেও ঘরটি পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী করতে আরও বড় অঙ্কের আর্থিক তহবিল প্রয়োজন।
সমাজকর্মী সোয়েব জানান, ঘরটির চারপাশের টেকসই বেড়া নির্মাণ, চালের প্রয়োজনীয় নতুন টিন, অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী কেনা এবং মিস্ত্রির মজুরিসহ ঘরটি সম্পূর্ণ মেরামত করতে আরও অন্তত ২২ হাজার টাকা প্রয়োজন। অর্থের তীব্র সংকটে গত এক মাস ধরে ঘরটির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সামান্য মেঘের ডাক কিংবা জোয়ারের বাতাস এলেই তিনটি নিষ্পাপ শিশুকে বুকে জড়িয়ে সাহারা বেগমকে এক অজানা আতঙ্কে রাত কাটাতে হয়। প্রতিটি মেঘলা রাতই এখন এই পরিবারের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত।
সাহারা বেগম অশ্রুভেজা কণ্ঠে জানান, অনেক কষ্ট করে মানুষের দুয়ারে ঘুরে কিছু টাকা জোগাড় করেছিলেন, যার সাথে সমাজসেবক সোয়েবের অনুদান যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বাজারে নির্মাণসামগ্রীর ঊর্ধ্বগতির কারণে মিস্ত্রির খরচ মেটানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ঘরটির চারপাশ খোলা থাকায় সাপ-খোপ এবং চোরের উপদ্রব যেমন বেড়েছে, তেমনি ঝড়-বৃষ্টির পানি সরাসরি ঘরে ঢুকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সন্তানদের একটু নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে তিনি সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
এই দুরবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মনপুরা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও স্থানীয় শিক্ষক মহিবুল্লাহ ইলিয়াস বলেন, একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো এমন চরম ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া। দেশের বিত্তবান ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে এই পরিবারটি একটি স্থায়ী মাথার গোঁজার ঠাঁই পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মনপুরার বেড়িবাঁধের বাসিন্দারা এমনিতেই চরম ঝুঁকিতে আছেন, তার ওপর সাহারা বেগমের ঘরটি যেভাবে ভেঙে আছে, তা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
উপকূলের হতদরিদ্র মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করা ‘জাগ্রত মনপুরা ফাউন্ডেশন’-এর সভাপতি ও শিক্ষক মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, মনপুরা দ্বীপে সাহারা বেগমের মতো আরও অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের ফাউন্ডেশন সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ করলেও সাহারা বেগমের পুনর্বাসনে রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহৎ শিল্পপতিদের প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ড নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই অসহায় পরিবারটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে।



