ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো অংশ দখলে নিয়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর কার্যত একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। গত সপ্তাহে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং সংলগ্ন মায়ুন (পেরিম) দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হুতি বাহিনী এখন আফ্রিকান উপকূলের মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, ইয়েমেনে এই সাম্প্রতিক সামরিক পটপরিবর্তনের জেরে তীব্র শরণার্থী সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতির উপকূলীয় শহর ওবে আশ্রয় নিয়েছেন। আইওএম জানিয়েছে, এসব বাস্তুচ্যুত মানুষদের জরুরি খাদ্য ও পানির সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তবে সহায়তার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের মোট পণ্যের প্রায় ১২ শতাংশ, সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের ১১ শতাংশ এবং এলএনজির ৮ শতাংশ অতিক্রম করে এই সংকীর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও প্রাক্তন নৌ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রু ক্রিস্তিয়ান হুদিস্তেয়ানু আল-জাজিরাকে জানান, প্রণালিটি সরু হওয়ায় উপকূলীয় ভারী কামান বসিয়েই এখন যেকোনো জাহাজে হামলা চালানো সম্ভব। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নৌবহরগুলোতে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই রুটে জাহাজ চলাচল ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কমে গেছে। ফলে বাণিজ্য জাহাজগুলোকে এখন কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা প্রতিটি যাত্রায় অতিরিক্ত ২০ দিনের সময় ও বিপুল পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য হাজেম আল-আসাদ অবশ্য দাবি করেছেন যে, লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর বড় অংশের নজর হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে চলে যাওয়ায় আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। হুদিস্তেয়ানু সতর্ক করে জানান, এই সুযোগে সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুতার ঘটনা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
বাণিজ্যিক পথ পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে মিসর। সুয়েজ খালের টোল বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশটি ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার আয় হারিয়েছে, যা তাদের রাজস্বের প্রায় ৬০ শতাংশ। তা সত্ত্বেও, সংঘাত নিরসন বিশেষজ্ঞ বদর হাসান আল-শাফেই মনে করেন, রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণেই মিসর ইয়েমেন পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রয়েছে।
অন্যদিকে এই সংকটের সুবিধা তুলে নিচ্ছে অপর আফ্রিকান দেশ ইরিত্রিয়া। বাব আল-মানদেবের উল্টো পাশে অবস্থিত দেশটি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতায় থাকলেও প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কি নিজের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছেন। সার্বিকভাবে, লোহিত সাগরে হুতিদের এই অগ্রগতি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায় নতুন মেরুকরণ ঘটাচ্ছে।



