দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একপ্রকার অটুট ও চিরস্থায়ী বলেই বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এই ঐতিহাসিক মৈত্রীতে বড় ধরনের ফাটল ধরার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ইসরায়েলের নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ইরানের সঙ্গে চলমান সর্বাত্মক যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা তেল আবিবকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। অনেক ইসরায়েলি কৌশলবিদ এখন খোলাখুলিভাবেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কি আসলেই এখনো হোয়াইট হাউসে তাঁদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নিঃশর্ত বন্ধু হিসেবে গণ্য করা যায়?
এই মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগকে আরও উসকে দিয়েছে গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসনাল প্রাইমারির ফলাফল। জেরুজালেমের পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি-অধ্যুষিত শহর নিউইয়র্ক। অথচ সেখানে ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থনপুষ্ট তিন ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডেমোক্র্যাট-দলীয় প্রাইমারিতে বিশাল জয় পেয়েছেন। ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার, ব্র্যাড ল্যান্ডার ও ক্লেয়ার ভালদেজের মতো এই প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে ইসরায়েলপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনায়াসে পরাজিত করেছেন। তাঁরা কেবল ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমালোচনাই করেননি, বরং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নির্মম ধ্বংসযজ্ঞকে সরাসরি ‘গণহত্যা’ ও ইসরায়েলকে একটি ‘বর্ণবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন; এমনকি ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এই নির্বাচনী ফলকে ইসরায়েলের জন্য এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তেল আবিবের বর্তমান ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, প্রগতিশীল, শান্তিপ্রিয় ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বিশ্বাসী ইসরায়েলিদেরও এখন মার্কিন মূলধারায় ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা দিন দিন তা বিশ্বাস করে ভোট দিচ্ছেন। মূলত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া এবং গত দুই বছর ধরে চলমান গাজা যুদ্ধের চরম নির্মমতা—যেখানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, হাসপাতাল-স্কুল ধ্বংস করা হয়েছে এবং কৃত্রিম খাদ্যসংকট তৈরি করে ফিলিস্তিনিদের অনাহারের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—তা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও এপ্রিলে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপেও দেখা গেছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের সহানুভূতি এখন ইসরায়েলের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি এবং ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল সি কার্টজার দুই দেশের এই কূটনৈতিক সংকটকে একটি ‘বড় খাদের কিনারে এগিয়ে যাওয়ার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের মূল আপত্তি যেখানে মানবাধিকার ও নৈতিকতার দূরত্বে, সেখানে রিপাবলিকান সমালোচকদের বড় অংশই এখন প্রশ্ন তুলছেন—ইসরায়েল নিজের আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে এনে মার্কিন জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করছে কি না। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে যদি মার্কিন জনগণকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়, তবে এই ক্ষোভ আরও তীব্র হবে। ফলে, বছরে শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা, জাতিসংঘে মার্কিন ভেটো কিংবা ইসরায়েলি দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য কর-সুবিধা পাওয়ার মতো দীর্ঘদিনের নিঃশর্ত সুবিধাগুলো ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ বন্ধ বা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। খোদ ট্রাম্প প্রশাসনও এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনার স্বার্থে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল।
আপাতদৃষ্টিতে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো অস্ত্র বিক্রি দ্রুত করা বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কড়া পদক্ষেপ নিলেও, সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে তেল আবিব চরম সংকটে। সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এই পরিস্থিতিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করে সতর্ক করেছেন যে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইসরায়েল একটি কৌশলগত সম্পদের বদলে বড় ধরনের ‘বোঝা’ (Liability) হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে, যা ইসরায়েলের জন্য এক চরম নিরাপত্তা বিপর্যয়। তেল আবিবের ডেপুটি মেয়র আসাফ জামিরের মতে, আসল ভয় সামরিক সহায়তা হারানো নয়; আসল ভয় হলো বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সেই মনস্তাত্ত্বিক ভরসাটুকু চিরতরে হারিয়ে ফেলা—যা এত দিন যেকোনো পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিকে থাকার সাহস জুগিয়েছে।



