― Advertisement ―

“ট্রাম্পকে না বলার ক্ষমতা ইসরাইলের আছে”; মার্কিন চাপের মুখে নিজস্ব অস্ত্র ব্যবস্থা গড়ার মরিয়া ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ স্বাক্ষর এবং লেবানন ফ্রন্টে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির চাপের মুখে মার্কিন-ইসরাইল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নজিরবিহীন ফাটল দেখা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) প্রশাসনের এই আকস্মিক মধ্যপ্রাচ্য নীতির জেরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) মঙ্গলবার (২৩ জুন, ২০২৬) এক নীতি নির্ধারণী বক্তৃতায় ঘোষণা করেছেন, ইসরাইলকে এখন থেকে অবশ্যই মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমাতে হবে এবং একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বাধীন অস্ত্র ব্যবস্থা (Independent Weapons System) গড়ে তুলতে হবে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ গুশ এতজিওন (Gush Etzion) বসতি ব্লকে রিজার্ভ কমব্যাট অফিসারদের একটি বিশেষ কোর্সে অংশ নিয়ে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেন, তেল আবিব ওয়াশিংটনের কৌশলগত সহযোগিতার মূল্যায়ন করলেও বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজস্ব সার্বভৌম সামরিক সক্ষমতা অর্জন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

নেতানিয়াহুর এই আত্মনির্ভরশীলতার ঘোষণার ঠিক পরপরই ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন ইসরাইলের উগ্র-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির (Itamar Ben-Gvir)। ইসরাইলি গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক ‘আরুতজ শেভা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেন-গভির সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেকোনো সিদ্ধান্ত বা যুদ্ধবিরতির অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতা ইসরাইলের রয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে নিজের কট্টর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, হোয়াইট হাউস থেকে যত চাপই আসুক না কেন, কোনো অবস্থাতেই লেবানন ফ্রন্টে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা আপস চুক্তি করতে দেওয়া হবে না। একই সাথে তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি বছরের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের পরও তাদের বর্তমান কট্টর ডানপন্থী কোয়ালিশন সরকারই ইসরাইলের ক্ষমতায় টিকে থাকবে।

ইসরাইলি শীর্ষ নেতৃত্বের এই আমেরিকা-বিরোধী সুর মূলত গত ১৪ জুন পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ১৪ দফার যুগান্তকারী শান্তি চুক্তির প্রতিক্রিয়া। ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ নামের এই চুক্তিটি গত ১৮ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। এই চুক্তির মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—লেবাননসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই ঐতিহাসিক দেতাত বা সমঝোতা সুপ্রিম লিটিগেশন ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে, যা তেল আবিবকে কৌশলগতভাবে চরম একাকীত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance) অবশ্য ইসরাইলি ক্যাবিনেটের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহের তীব্র সমালোচনা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার এক কড়া বিবৃতিতে ভ্যান্স মনে করিয়ে দেন, গত তিন মাসে ইসরাইলের আকাশ সুরক্ষায় ব্যবহৃত মোট রক্ষণাত্মক অস্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকার তৈরি এবং মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিশোধিত। ভ্যান্স স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি যদি ইসরাইলি ক্যাবিনেটের সদস্য হতাম, তবে বিশ্বের একমাত্র শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত মিত্রের ওপর এভাবে আক্রমণ করতাম না।” মার্কিন নাগরিকদের তরফ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধ বন্ধের জন্য যখন তীব্র ঘরোয়া চাপ রয়েছে, তখন নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের এই স্বাধীন অস্ত্র ব্যবস্থা গড়ার ঘোষণা মূলত হোয়াইট হাউসের শান্তি পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার একটি মরিয়া আঞ্চলিক প্রয়াস বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।