দেশে গত দুইটি জাতীয় নির্বাচনে জালভোট, দিনের ভোট রাতে অথবা আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির মতো নানা অনিয়ম-কারচুপির ঘটনা-অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে।
এমতাবস্থায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে যদি কোনো ভোটার দেখেন যে তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছে, তাহলে তার প্রতিকারের বিধান রয়েছে বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনে। তবে আইনটিকে প্রতারণামূলক বলছেন বিশ্লেষকরা।
টেন্ডার্ড ভোট কি?
আইন বলছে, এক্ষেত্রে ভোটার যদি নিজের পরিচয় দেন এবং তিনি ভোট দেননি এই বিষয়টি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে বোঝাতে সক্ষম হন, তাহলে তিনি ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। আইনের ভাষায় এই ভোটটিকে বলা হয় ‘টেন্ডার্ড ভোট’।
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনে এই টেন্ডার্ড ভোটের বিধান থাকলেও এই ভোট সম্পর্কে যেমন সাধারণ মানুষের ধারণা নেই, তেমন এই ভোটের রীতিও চালু নেই।
কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- টেন্ডার্ড ভোটের মাধ্যমে ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেও সেটিকে রাখা হয় না ব্যালট বাক্সে, কিংবা গণনাও করা হয় না।
তাই এই টেন্ডার্ড ভোটটিকে একদিকে ‘সান্ত্বনামূলক’, অন্যদিকে ‘প্রতারণামূলক’ ভোট বলেও আখ্যা দিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, ‘কোনো ভোটার যদি দেখেন তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছে, তখন তিনি যে ভোট দেননি সেটি নিশ্চিত করতে পারলে তাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। সেই ভোটটিকে বলে টেন্ডার্ড ভোট’।
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনে যা আছে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে এই টেন্ডার্ড ভোটের বিধান যুক্ত রয়েছে। আরপিওর ৩২ এর (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ব্যালট পেপারের জন্য আবেদন করিয়া অবগত হন যে, অন্য কোনো ব্যক্তি ইতঃপূর্বে নিজেকে উক্ত ভোটার হিসাবে ঘোষণা করিয়া আবেদনকারীর নামে ভোট প্রদান করিয়াছেন, তাহা হইলে তিনি অন্য যে কোনো ভোটারের ন্যায় একই পদ্ধতিতে এই অনুচ্ছেদের বিধান সাপেক্ষে, একটি ব্যালট পেপার পাইবার অধিকারী হইবেন।’
আরপিওতে আরো বলা আছে- টেন্ডার্ড ব্যালট পেপার পাওয়ার পর ভোটার ওই ব্যালটে ভোট দেবেন। তবে ভোট দেওয়ার পর ভোটার ওই ব্যালট পেপারটি নির্দিষ্ট ব্যালট বাক্সে ফেলতে পারবেন না। সেটি প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে জমা দেবেন।
প্রিসাইডিং অফিসার ওই ব্যালটটিকে আলাদা একটি খামে রেখে সেখানে ওই ভোটারের নাম ও ভোটার নম্বর লিপিবদ্ধ করে রাখবেন। শুধু আমাদের বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের ক্ষেত্রে টেন্ডার্ড ভোটের বিধান চালু রয়েছে বলেও জানান নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, ‘কোনো ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যদি দেখেন তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছেন তখন স্বাভাবিকভাবে তিনি প্রতিবাদ কিংবা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তখন তাকে সান্ত্বনাস্বরুপ এই ভোটটি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে।’
তিনি আরো বলেন, এমনসব পরিস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তখন আইনপ্রণেতারা এই টেন্ডার্ড ভোটের বিধান চালু করেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটারকে সান্ত্বনা দেওয়া।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাক্ষর করে ভোট দেওয়ার পরও টেন্ডার্ড ভোট গণনা করা হয় না, এর মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করা হয়।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলছেন, ‘এই টেন্ডার্ড ভোটটা কখনই গণনা করা হয় না। এটা একদিক থেকে চিন্তা করলে ভোটারের সঙ্গে প্রতারণা। ভোটার জানছেন তার ভোট নেওয়া হয়েছে, অথচ তিনি জানতে পারছেন না যে, তার ভোটটা গণনা করা হচ্ছেনা। কাজেই ওই ভোটারকে একভাবে প্রতারিত করা হচ্ছে’।
তবে কেন এই ভোট?
যে ভোট গণনাই করা হয় না, সেই ভোটের বিধান কেন আইনে যুক্ত করা হয়েছে এই প্রশ্নও সামনে আসছে।
জবাবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই ভোট গণনায় ধরা হয় তাহলে এটি নিয়ে বড় ধরনের সংকটও তৈরি হতে পারে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে নানা প্রশ্ন ছিল। ওই নির্বাচনে সারাদেশের ১৯৭টি ভোট কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছিল।
নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বলেন, ‘যদি কোন কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ে। অন্যদিকে কয়েকজন টেন্ডার ভোটও দেয় এবং ওই ভোটগুলোও যদি গণনা করা হয় তখন দেখা যাবে যে ভোটের হার শতভাগেরও বেশি হয়েছে। সেটি হলে আইন অনুযায়ী কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। যে কারণে টেন্ডার ভোটটিকে গণনা করা হয় না”।
সূত্র: বিবিসি বাংলা



