নিজস্ব প্রতিবেদক
অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দায়িত্ব পালনে অবহেলা যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে প্রশাসনে। কেন্দ্র থেকে মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে সেই পুরনো চিত্র। অধিকাংশ অনিয়মের ক্ষেত্রে নির্বিকার নীতিনির্ধারকেরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট (চেতনা) ধারণ ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রশাসন তৈরিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী স্বৈরশাসনের পতন হলেও গত এক বছরে শৃঙ্খলা ফেরেনি বিশৃঙ্খল প্রশাসনে। তার বদলে প্রশাসনকে লন্ডভন্ড করা হয়েছে।
তবে বিতর্কিত দুইটি নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা ৫১ ডিসিকে ওএসডি, গত সাড়ে ১৫ বছরে বঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসন ক্যাডারের ৭৬৪ ও অন্যান্য ক্যাডারের ৭৮ জনের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ৪৫ জনের পদোন্নতি, সিনিয়র সচিব ও সচিব পর্যায়ের ২৫ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে একজন যুগ্মসচিব ও একজন সহকারী কমিশনারকে চাকরিচ্যুত করা, কর্মচারীদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া, পে-কমিশন গঠন, সব ধরনের অনুদান ও ভাতা বাড়ানোসহ গত এক বছরে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
গত এক বছরে প্রশাসনের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিসহ নানা পদক্ষেপে বছরজুড়েই ছিল সমালোচনা। এর মধ্যে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। এ ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছিল খোদ জনপ্রশাসন সচিবের বিরুদ্ধেও।
শুধু তাই নয়, প্রায় ১৬ বছর পর ঢাকঢোল পিটিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সম্পদের হিসাব (বিবরণী) নেওয়া হলেও তা যাচাই-বাছাই করা হয়নি। পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি করে প্রশাসনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে সাবেক সচিব, অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের সভাপতি এবিএম আব্দুস সাত্তার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, প্রশাসনে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা গত এক বছরে বেড়েছে। চালকের আসনে বসা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, সীমাহীন লোভ এবং দুর্বল নেতৃত্বের কারণে এসব ঘটনা ঘটেছে।
প্রশাসন পরিচালনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছেনা। বিএনপিপন্থি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এখনো প্রতিপক্ষ হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। এমনকি প্রশাসনে বহিরাগতরা গিয়ে খবরদারি করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের ‘টপ টু বটম’ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। ঘুস, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা অতীতের চেয়ে বেড়েছে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেছে। আমরা এ বিষয়গুলো প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেছি।
সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, ’২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রশাসনে স্থিতিশীলতা আসেনি। আমার মতে, প্রশাসন, পুলিশ এবং বিচারালয়ে সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সব জায়গায় এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।’
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, জনপ্রত্যাশা ছিল বিগত ফ্যাসিবাদের সময়ে প্রশাসনকে যেভাবে নষ্ট-ভ্রষ্ট করা হয়েছে, সেখান থেকে পুনরুদ্ধার হবে। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি। উলটো পুরো প্রশাসনকে আস্থাহীনতার অতল গহবরে নিমজ্জিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের এমন ভঙ্গুর অবস্থা বিগত ৫৩ বছরে আর দেখা যায়নি। এ অবস্থা থেকে প্রশাসন আগামী দশ বছরেও স্বাভাবিক হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এটা জাতির জন্য চরম হতাশার বিষয়।



