ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের মধ্যেকার ঐতিহাসিক অল-ওয়েদার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপকে আরও সুসংহত করতে চার দিনের এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। গতকাল শনিবার (২৩ মে, ২০২৬) চীনের চচিয়াং প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী হাংচৌ শিয়াওশান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ কূটনৈতিক অভ্যর্থনা জানানো হয়। চচিয়াং প্রদেশের শিয়াওশান এয়ারপোর্টে শাহবাজ শরিফকে স্বাগত জানান প্রদেশের ভাইসরয় বা ভাইস গভর্নর সু ওয়েনগুয়াং (Xu Wenguang)। এ সময় বিমানবন্দরে কূটনৈতিক প্রটোকল দিতে পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত জিয়াং জাইদং এবং বেইজিংয়ে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত খলিল হাশমি উপস্থিত ছিলেন। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে শাহবাজের এই সফরটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
হাংচৌ শহরে পৌঁছানোর পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) চচিয়াং প্রাদেশিক কমিটির প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক বা সেক্রেটারি ওয়াং হাওয়ের (Wang Hao) সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে চীনের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র চচিয়াং প্রদেশ এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাঞ্জাব প্রদেশের মধ্যে ‘সিস্টার-প্রভিন্স’ (Sister-Province) বা ভগিনী-প্রদেশ সম্পর্ক স্থাপনের একটি যুগান্তকারী সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সরাসরি প্রাদেশিক স্তরে বিনিয়োগ ও বিনিময়ের দ্বার উন্মোচন হলো। একই সাথে হাংচৌ নরমাল ইউনিভার্সিটি এবং বেইজিংয়ে পাকিস্তানি দূতাবাসের মধ্যে একটি যৌথ প্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে রয়েছেন পাকিস্তানের এক শক্তিশালী উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন নবনিযুক্ত উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার, তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী শাজা ফাতিমা এবং প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা তারিক ফাতেমি। সফরসূচি অনুযায়ী, হাংচৌতে আলিবাবা সদর দপ্তর পরিদর্শন এবং সিপেক (CPEC) ফেজ-২ সংক্রান্ত একটি বিজনেস-টু-বিজনেস (B2B) ইনভেস্টমেন্ট কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সেখানে তিনি চীনের শীর্ষ নির্বাহী ও দূরদর্শী প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসবেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি জানিয়েছেন, ২৩ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত চলমান এই রাষ্ট্রীয় সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও সিপেক প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের উচ্চ-মানের উন্নয়নের পাশাপাশি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি প্রাধান্য পাবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত এবং যুদ্ধবিরতির পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আলোচনায় পাকিস্তান ও চীনের যৌথ মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে বেইজিংয়ে গভীর স্ট্র্যাটেজিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে এর আগে উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের চীন সফরের সময় যে ‘পাঁচ-দফা মূলনীতি’ (Five-Point Principle) যৌথভাবে জারি করা হয়েছিল, শাহবাজ-সি চিন পিং বৈঠকে সেটির বাস্তবায়ন ও হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ সচল করার রোডম্যাপ নিয়েও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।



