বাংলাদেশের বিচার বিভাগীয় ইতিহাসে এক বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করার লক্ষ্যে জারি করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশগুলো আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল ২০২৬) জাতীয় সংসদে বাতিলের প্রস্তাব পাস হয়েছে। বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি ও বাগ্বিতণ্ডার মধ্য দিয়ে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ অনুমোদিত হয়। এর ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক বাছাই এবং প্রধান বিচারপতির অধীনে আলাদা সচিবালয় পরিচালনার যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল, তা রদ হয়ে বিচার বিভাগ আবার আগের প্রশাসনিক কাঠামোতে ফিরে গেল।
বিলে বলা হয়েছে, রহিত হওয়া অধ্যাদেশের অধীনে ইতিমধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত ২৫ জন বিচারকের পদ এবং গৃহীত ব্যবস্থাগুলো বৈধ হিসেবেই গণ্য হবে। তবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য সৃষ্ট পদগুলো বিলুপ্ত হবে এবং এর বাজেট ও যাবতীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব পুনরায় সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে ন্যস্ত হবে। সংসদে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলীয় সদস্যরা সরকারের এই পদক্ষেপকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর ‘নগ্ন হস্তক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এর মাধ্যমে আবারও নিম্ন আদালতকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং আরও স্বচ্ছ ও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা হবে। তিনি অতীতে বিচার বিভাগের রাজনীতিকীকরণের উদাহরণ টেনে বলেন, সরকার চায় এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে যেখানে আর কোনো বিতর্কিত নিয়োগের সুযোগ থাকবে না। বিরোধী দলের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এবং এনসিপির আখতার হোসেনের নানা যুক্তির জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার মানদণ্ড নিরূপণের জন্য সরকার নতুন করে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এই বিল পাসের ফলে বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া আবারও সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির (প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে) হাতে ফিরে গেল। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে জারি করা সেই অধ্যাদেশে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক বাছাইয়ের বিধান ছিল। আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রহিতকরণ বিল পাসের পর বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের ইস্যুটি আবারও নতুন করে জাতীয় তর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



