মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতা আর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্যে ইরান তাদের নতুন অভিভাবকের নাম ঘোষণা করেছে। প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনিকে দেশটির পরবর্তী ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। সোমবার (৯ মার্চ ২০২৬) ভোরে তেহরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি বিশ্ববাসীকে জানায়। দেশটির ৮৮ জন শীর্ষ ধর্মতাত্ত্বিকের সমন্বয়ে গঠিত প্রভাবশালী ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ এক চূড়ান্ত ভোটাভুটির মাধ্যমে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবাকে এই মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ যৌথ হামলায় আলি খামেনির মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া নেতৃত্বশূন্যতা পূরণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
মোজতবা খামেনির উত্থান দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বিশেষ বার্তা বহন করছে। যদিও তিনি এর আগে কখনও কোনো সরকারি পদে আসীন হননি কিংবা নির্বাচনে অংশ নেননি, তবুও পর্দার আড়ালে তাঁর প্রভাব ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড’-এর সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। পিতার বার্ধক্যজনিত কারণে গত কয়েক বছর ধরে মোজতবাই ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও কৌশলগত অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এই উত্তরাধিকার ভিত্তিক পরিবর্তন ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পরবর্তী কাঠামোকে কতটা শক্তিশালী করবে, তা এখন দেখার বিষয়।
তবে মোজতবা খামেনির এই অভিষেক আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে ওয়াশিংটনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মনোনয়ন ঘোষণার আগেই তাঁর আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ বা মতামতের গুরুত্ব থাকতে হবে। তবে তেহরান সেই দাবিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে মোজতবাকেই নেতৃত্বের শীর্ষে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের এই বৈরী মনোভাবের বিপরীতে ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট দেশটির জনগণের প্রতি নতুন নেতার সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটি কেবল তৃতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ নেতা পরিবর্তনের ঘটনা। প্রথম নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি এবং দ্বিতীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পর মোজতবা এখন দেশটির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার অধিকারী। এমন এক সময়ে তিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন যখন ইরান একদিকে বহিরাগত হামলার ক্ষত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিশ্বশক্তির নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। মোজতবা খামেনির এই যাত্রা কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক নতুন মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



