নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন না করা, শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষার মান কমতে কমতে এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি শিশু ১৮ বছর বয়সে সাধারণত ১১ বছর মেয়াদি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন্ন করে (প্রথম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণি)।
কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা শেখার মান বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৬.৫ বছরের সমতুল্য। অর্থাৎ শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানে বাংলাদেশ অন্তত ৪.৫ বছর পিছিয়ে। সে ক্ষেত্রে দেশের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সপ্তম শ্রেণির সমমানের, যা শিক্ষার গুণগত দুর্বলতার বড় প্রমাণ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবই ঠিকভাবে পড়তে পারে না। এছাড়া, বিশ্ব র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো অবস্থান করে নিতে পারছে না।
দেশে ১৭ বছর ধরে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু থাকলেও সৃজনশীল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানিতে। শুধু তাই নয়, দেশে যত বেকার আছে তার ১৩ শতাংশই স্নাতক ডিগ্রীধারি।
শিক্ষাবিদদের পরামর্শ, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘শিক্ষার মানের দিক দিয়ে আমরা খুব একটা এগোতে পারছি না। তবে সেটা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো নয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা বুদ্ধিমান। এত দিন আমাদের শিক্ষক নিয়োগের মান ভালো ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘ফান্ডের সংকটে গবেষণা পিছিয়ে আছে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের যে বেতন দেওয়া হয়, তা খুবই কম। ফলে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আসছে অনিহা দেখা যাচ্ছে। তাই শিক্ষার মান বাড়াতে এই খাতের বাজেটও অনেক বাড়ানো উচিত।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের ২০২২ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাংলায় ও ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণি বিবেচনায় প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মাতৃভাষা বাংলায়ই অর্ধেক শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার মান নিম্নমুখী কি না, সেটা জানার জন্যও গবেষণার দরকার। তবে গ্লোবালি শিক্ষাব্যবস্থা খুব বেশি ট্রান্সফর্ম হচ্ছে। এতে অন্য দেশের নীতিনির্ধারকরা যে পদক্ষেপগুলো নিতে পারছেন, আমাদের দেশে তা পারছেন না।
তিনি আরো বলেন, এডুকেশন নিয়ে আমাদের কোনো ভিশন নেই, পলিসিরও ঠিক নেই। কারিকুলামও না বুঝে-শুনে পরিবর্তন করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের পাশের দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের গ্লোবালি পারফরম্যান্স ভালো। কিন্তু আমাদের সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকারে রাখছে না।’



