বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন ও উত্তপ্ত অধ্যায়ের সূচনা হলো। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ ২০২৬) বেলা ১১টায় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনটি ছিল নজিরবিহীন ঘটনায় ঠাসা। অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দিতে শুরু করলে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষার দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিয়ে তাঁরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ (ওয়াক আউট) করেন। হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ অব্যাহত রাখেন, যেখানে তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন এবং জুলাই শহীদদের স্মরণে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন।
অধিবেশনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৯৭১-এর শহীদদের এবং প্রয়াত গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিরপেক্ষতার স্বার্থে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
এদিন সংসদে শোকপ্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং পোপ ফ্রান্সিসের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে শোক প্রকাশ করা হয়। তবে বিরোধী দল জামায়াত ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং আবরার ফাহাদের নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হলে স্পিকার তা গ্রহণ করেন। সংসদের এই অধিবেশনটি কেবল আইন প্রণয়নের স্থান নয়, বরং জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
সংসদের দর্শক গ্যালারিতে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিবারের সদস্যরা। কারিগরি ত্রুটির কারণে অধিবেশনের মাঝপথে স্পিকারকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায়। সব মিলিয়ে, প্রথম অধিবেশনেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যেমন সহযোগিতার ইঙ্গিত মিলেছে, তেমনি জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে মতভেদের উত্তাপও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সংসদ মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে।



