দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সামরিক শাসন জারির চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োলকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিয়ে গেল। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সিউলের একটি আদালত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সেই বিতর্কিত মার্শাল ল’ জারির দায়ে ইউনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। বিচারক জি কুই-ইউন রায় ঘোষণার সময় অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ইউন অবৈধভাবে সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে জাতীয় পরিষদ দখল এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আজীবন ক্ষমতায় থাকার এক ‘বিদ্রোহী’ নীল নকশা সাজিয়েছিলেন। এই রায় দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যা প্রমাণ করে যে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
ইউনের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল তথাকথিত “রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি” দমনের অজুহাত। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন; ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাত্র ছয় ঘণ্টার সেই সামরিক অবরোধের সময় সংসদ সদস্যরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ব্যারিকেড ভেঙে অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন এবং সর্বসম্মত ভোটে মার্শাল ল’ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এরপর থেকেই ইউনের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সাংবিধানিক আদালত তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণ করে এবং গত জুলাই থেকে তিনি কারাবন্দি অবস্থায় একের পর এক ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হচ্ছিলেন। আজকের এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মূলত তাঁর সেই উচ্চাভিলাষী ক্ষমতার মোহের চূড়ান্ত পরিণতি।
আদালত প্রাঙ্গণে আজ ছিল টানটান উত্তেজনা। ইউনকে বহনকারী কারা বাস যখন চত্বরে পৌঁছায়, তখন তাঁর সমর্থক ও কট্টর সমালোচকদের পাল্টাপাল্টি স্লোগানে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। যদিও বিশেষ প্রসিকিউটর ইউনের জন্য মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন, কিন্তু আদালত তাঁর সেই প্রচেষ্টায় কোনো প্রাণহানি না ঘটায় যাবজ্জীবন দণ্ডকেই যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯৯৭ সালের পর থেকে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ায় এই যাবজ্জীবনই বর্তমানে দেশটির সর্বোচ্চ কার্যকর সাজা হিসেবে বিবেচিত। ইউনের আইনজীবীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানা গেছে, তবে আইনি বিশ্লেষকদের মতে, সাজার পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ইউনের পাশাপাশি তাঁর সহযোগীরাও পার পাননি। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম ইয়ং হিউন সেনা মোতায়েনে তাঁর কেন্দ্রীয় ভূমিকার জন্য ৩০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হান ডাক-সু ২৩ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন মন্ত্রিসভার নথি জালিয়াতি এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে সামরিক আইনকে বৈধ করার চেষ্টার দায়ে। এই গণদণ্ড মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় শুদ্ধি অভিযানেরই একটি অংশ। সিউলের আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দেওয়া এই বার্তাটি কেবল ইউনের জন্য নয়, বরং বিশ্বের সকল স্বৈরশাসকের জন্য এক সতর্কবাণী যে, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে বন্দুকের নলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত করুণ পরিণতিই ডেকে আনে।



