প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবন এখন উপকূলীয় জেলে ও বনজীবীদের জন্য এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম। দীর্ঘদিন শান্ত থাকার পর সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একাধিক জলদস্যু বাহিনী। বিশেষ করে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় দস্যুদের দৌরাত্ম্য এখন তুঙ্গে। গত তিন মাসে বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক জেলেকে অপহরণ করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করার খবর পাওয়া গেছে। দস্যুদের এই ভয়ংকর থাবায় মৎস্যজীবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। জীবন জীবিকার তাগিদে যারা নোনা জলে জাল ফেলতেন, তাঁরা এখন প্রাণভয়ে বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে উপকূলীয় পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে তীব্র অর্থ সংকট।
দস্যুদের এই অপহরণ বাণিজ্য এখন রীতিমতো এক অশুভ উৎসবে পরিণত হয়েছে। মোংলা ও শরণখোলার মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পূর্ব সুন্দরবনের মরা ভোলা, আলী বান্দা, ধঞ্চে বাড়িয়া এবং আন্ধারমানিকের মতো দুর্গম এলাকাগুলোতে দস্যুরা আস্তানা গেড়েছে। জেলেদের অপহরণ করার পর প্রতিটি ট্রলার বা জন প্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। অনেক জেলে পরিবার জমিজমা বা শেষ সম্বল বিক্রি করে গোপনে মুক্তিপণ দিয়ে স্বজনদের ছাড়িয়ে আনছেন। আবার অনেকে এখনো জলদস্যুদের অন্ধকার ডেরায় বন্দি হয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। দস্যুদের এই বিচারহীনতা এবং একের পর এক অপহরণের ঘটনা সুন্দরবনের শান্ত পরিবেশকে আবারও অশান্ত করে তুলেছে।
সবশেষ ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে সুন্দরবনের দুবলার চরের নারিকেলবাড়ীয়া ও আমবাড়ীয়া এলাকায় জলদস্যুরা একযোগে তাণ্ডব চালিয়েছে। ২০টি মাছ ধরার ট্রলারে হামলা চালিয়ে ২০ জন জেলেকে তুলে নিয়ে গেছে দস্যুরা। এর মাত্র তিন দিন আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি একই এলাকা থেকে আরও ৬ জন জেলেকে অপহরণ করা হয়েছিল। বর্তমানে কমপক্ষে ২৬ জন জেলে দস্যুদের হাতে জিম্মি অবস্থায় আছেন। অপহৃত এই জেলেরা মূলত খুলনা, পাইকগাছা ও আশাশুনি এলাকার বাসিন্দা। এই ধারাবাহিক অপহরণের ঘটনা প্রমাণ করে যে, দস্যুরা সুন্দরবনের নিরাপত্তাবলয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে এখন কান্নার রোল, কারণ মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করার সাধ্য নেই অনেকেরই।
দস্যু দমনে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী অভিযান চালালেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে র্যাব ও কোস্টগার্ডের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বনরক্ষীদের টহল আরও জোরদার করার পাশাপাশি জেলেদের নিরাপত্তার স্বার্থে রাতে বন অফিস সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ জেলেদের দাবি, কেবল নির্দেশনা নয়, সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে হলে পূর্বের মতো সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন। বনের রাজা বাঘের ভয়ের চেয়েও এখন মানুষরূপী দস্যুদের ভয়ে থরথর করে কাঁপছে গোটা উপকূল।



