গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে কেবল ইটের টুকরো আর ধুলোবালি নয়, চাপা পড়ে আছে হাজার হাজার নাম না জানা প্রাণ। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদন বিশ্ববিবেকের কাছে এক কঠিন সত্য উন্মোচন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই গাজায় ‘সহিংস মৃত্যু’র সংখ্যা ৭৫ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল এবং পশ্চিমা বিশ্বের অনেক অংশ থেকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহতের সংখ্যা নিয়ে যে সন্দেহ পোষণ করা হচ্ছিল, ল্যানসেটের এই তথ্য সেই সংশয়কে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। বরং দেখা যাচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের দেওয়া তথ্যের চেয়েও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি, যা এই যুদ্ধের ভয়াবহতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
‘গাজা মরটালিটি সার্ভে’ (GMS) নামের এই খানাভিত্তিক জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে অত্যন্ত কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালকে বিবেচনায় নিয়ে দেখা গেছে, গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.৪ শতাংশ মানুষ সরাসরি যুদ্ধকালীন সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। যখন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৪৯ হাজার ৯০ জন নিহতের তথ্য দিয়েছিল, ঠিক সেই সময়েই ল্যানসেটের গবেষণায় উঠে আসে সেই সংখ্যাটি আসলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবের চেয়েও প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। এর মানে দাঁড়ায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় শত শত মরদেহের হিসাব দাপ্তরিক খাতায় আজও ওঠেনি।
গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাট এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য কেবল বিশ্বাসযোগ্যই নয়, বরং এটি প্রকৃত নিহতের সংখ্যার সবচেয়ে নিম্নতম একটি খসড়া মাত্র। কারণ, তারা কেবল হাসপাতালে আসা বা নিশ্চিত শনাক্ত হওয়া মরদেহের হিসাব রাখে। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ যখন ভবনের নিচে চাপা পড়ে থাকে বা নিখোঁজ হয়ে যায়, তখন সেই সংখ্যাগুলো সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষকদের এই তথ্য প্রমাণ করে যে, গাজায় নিহতের জনমিতিক হার ফিলিস্তিনি সরকারি তথ্যের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে নারী, শিশু ও বয়স্কদের হারই অর্ধেকের বেশি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বারবার গাজার তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, জানুয়ারিতে একজন ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তার বক্তব্যেও নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার হওয়ার সম্ভাবনা উঠে এসেছে। ল্যানসেটের এই গবেষণায় ২ হাজার খানার প্রায় ৯ হাজার ৭২৯ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে যে তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়েছে, তা কোনো আনুমানিক সংখ্যা নয়, বরং একটি প্রমাণভিত্তিক সত্য। এই প্রতিবেদনটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং গাজার প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে থাকা মানুষের হাহাকারের এক দালিলিক প্রমাণ। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, গাজার ট্র্যাজেডি আমরা যতটুকু ভাবছি, তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর এবং অন্ধকার।



