বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ক্ষত প্রশ্নফাঁস ও নকলের সংস্কৃতিকে চিরতরে উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর মেয়াদে শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। অতীতে দায়িত্ব পালনকালেও তিনি নকল প্রতিরোধে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে মিলন বলেন, এবার আরও আধুনিক প্রযুক্তি ও নিবিড় নজরদারির মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতি উপহার দেওয়া হবে। এটি কেবল একটি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার একটি ধারাবাহিকতা যা শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
কারিকুলাম নিয়ে চলমান বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছেন একটি আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা। তিনি মনে করেন, ‘ব্যাকডেটেড’ বা মান্ধাতা আমলের শিক্ষা দিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব। বিশ্ব এখন একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে, তাই আমাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তাঁরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নেতৃত্ব দিতে পারেন। মন্ত্রীর এই ভিশনের মূলে রয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা। ন্যানো টেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং রোবটিক্সকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার যে পরিকল্পনা তিনি পেশ করেছেন, তা বাংলাদেশের গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও বঞ্চনা নিয়েও নীরবতা ভেঙেছেন মন্ত্রী। বেসরকারি শিক্ষকদের স্বল্প বেতন এবং অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। মিলন জানান, বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলের নজরে রয়েছে এবং একটি টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে কাজ চলছে। তবে এ ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং সময়োপযোগী ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এমপিওভুক্তি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রে অতীতে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখার পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে ড. মিলন বলেন, অতীতের কোনো অন্যায়ের দায়ভার বর্তমান সরকার নেবে না, তবে বর্তমান মেয়াদে কোনো ধরনের অনিয়ম হতে দেওয়া হবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও গতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। ইংরেজি দক্ষতা ও ডিজিটাল লিটারেসির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি শিক্ষার্থীদের গ্লোবাল সিটিজেন হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মন্ত্রীর এই সাহসী ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি যদি সঠিক বাস্তবায়নের মুখ দেখে, তবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি সুবর্ণ যুগের সূচনা হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



