সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যখন ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরমাণু আলোচনার দ্বিতীয় দফা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই তেহরান থেকে ভেসে এল এক বজ্রকঠিন হুঁশিয়ারি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হুমকির জবাব দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন রণতরিগুলো যেকোনো মুহূর্তে ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে’ দেওয়া হতে পারে। ট্রাম্পের ‘বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনী’ দাবির বিপরীতে খামেনির এই মন্তব্য কেবল একটি সামরিক বার্তা নয়, বরং এটি ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির এক কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
খামেনির এই বক্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, যদি পরমাণু আলোচনায় কোনো রফায় আসা সম্ভব না হয়, তবে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ দ্রুত পারস্য উপসাগরের অভিমুখে রওনা হবে। এর জবাবে খামেনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে বলেন, রণতরি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী যুদ্ধযন্ত্র, তবে তার চেয়েও বিপজ্জনক হলো ইরানের সেই প্রযুক্তি বা অস্ত্র যা এই দানবীয় তরিকে নিমেষেই সলিলসমাধি করতে সক্ষম। এই বাকযুদ্ধ এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির উপস্থিতিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষ আলোচনায় ব্যস্ত।
পারস্য উপসাগরের উত্তাল জলসীমায় ইতিপূর্বেই যুক্তরাষ্ট্র ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং কয়েকটি শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করেছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভিও খামেনির সুরেই সুর মিলিয়ে বলেছেন, ইরানের সাথে যেকোনো সংঘাত ট্রাম্পের জন্য এক তিক্ত ‘শিক্ষা’ হয়ে থাকবে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির মাঝে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ। খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আলোচনার টেবিলের ফলাফল আগেভাগে অনুমান করা বা ডিক্টেট করা হবে এক চরম বোকামি। তাঁর এই অনমনীয় অবস্থান প্রমাণ করে যে, ইরান চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়।
বর্তমানে ওমানি দূতাবাসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে যে পরোক্ষ কূটনীতি চলছে, তা মূলত ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আট মাস পর শুরু হওয়া প্রথম কোনো কার্যকর উদ্যোগ। পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের কালো মেঘ এবং জেনেভায় কূটনৈতিক শীতলতার এই দ্বৈত পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে এক সুতোর ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছে। একদিকে জ্বালানি ও খনি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার মার্কিন আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জেদ—সব মিলিয়ে জেনেভা আলোচনা কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি এড়ানোর শেষ সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।



