― Advertisement ―

এপস্টাইন ফাইলস: ক্ষমতার আড়ালে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ আলামত দেখছে জাতিসংঘ

জেফ্রি এপস্টাইন—এই নামটি এখন কেবল একজন মৃত যৌন অপরাধীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি অন্ধকার অপরাধচক্রের প্রতীক। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত লক্ষাধিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের একদল স্বাধীন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, এই অপরাধের ব্যাপ্তি ও নৃশংসতা এতটাই ভয়াবহ যে একে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার জোরালো ভিত্তি রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে ধামাচাপা পড়ে থাকা এই ফাইলগুলো যখন একে একে উন্মোচিত হচ্ছে, তখন বেরিয়ে আসছে কীভাবে বর্ণবাদ, আধিপত্যবাদী মানসিকতা এবং চরম নারীবিদ্বেষকে পুঁজি করে এক বৈশ্বিক অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। এই বিশেষজ্ঞদের মতে, এপস্টাইনের কর্মকাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি নারী ও কিশোরীদের অমানবিকীকরণ এবং পণ্য হিসেবে ব্যবহারের এক সুশৃঙ্খল পদ্ধতি।

বিশেষজ্ঞদের এই বিবৃতিতে যে বিষয়টি সবচেয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, তা হলো এই অপরাধের ‘পদ্ধতিগত চরিত্র’ (Systematic Nature)। তাঁরা বলছেন, এপস্টাইনের এই নেটওয়ার্ক কোনো সাধারণ অপরাধচক্র ছিল না; এটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব খাটিয়ে পরিচালিত হতো। প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, ১,২০০-এরও বেশি ভুক্তভোগী এই নৃশংসতার শিকার হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই নারকীয় কর্মকাণ্ডের গভীরতা এতটাই যে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সেই সব মানদণ্ড পূরণ করে যেখানে একে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলা যেতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে, আধুনিক বিশ্বে আইনের কঠোর নজরদারির মধ্যেও কীভাবে বছরের পর বছর এই অশুভ সাম্রাজ্য টিকে ছিল এবং কেন প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের কারণে তা বারবার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

নথি প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়েও জাতিসংঘের এই দলটি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। গত নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসে একটি আইন পাসের মাধ্যমে এই নথিপত্র জনসমক্ষে আনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই প্রকাশভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ। নথির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ কালিতে মুছে দেওয়া বা ‘রেডাকশন’ করার ফলে অনেক অপরাধীর পরিচয় এখনো আড়ালে রয়ে গেছে। এর বিপরীতে, ভুক্তভোগীদের অনেক ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য যথাযথভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়নি, যা তাঁদের জন্য দ্বিতীয়বার মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী একে ‘প্রাতিষ্ঠানিক গ্যাসলাইটিং’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে রাষ্ট্র অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করে তাঁদের কষ্টকে অবমূল্যায়ন করছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্কটি দানা বেঁধেছে এপস্টাইনের সাথে বৈশ্বিক প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে। ২০০৮ সালে প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেও এবং পরেও রাজনীতি, অর্থনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের বহু ক্ষমতাধর ব্যক্তির সাথে তাঁর দহরম-মহরম ছিল। ২০১৯ সালে ফেডারেল অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারের ভেতর রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হলেও, সেই রহস্যের জট এখনো পুরোপুরি খোলেনি। বিশেষজ্ঞরা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, কেবল নথি প্রকাশ নয়, বরং এই বৈশ্বিক চক্রের শেকড় উপড়ে ফেলে সব অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাবেন না। এই ফাইলগুলো এখন কেবল অপরাধের দলিল নয়, বরং বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।