ধনীর উপর ‘অতিধনী’ নামেও একটি বিশেষণ তৈরি হয়েছে। আল্ট্রা হাই নেট ওয়ার্থ (ইউএইচএনডাব্লিউ) বা অতিধনী তারাই যাদের সম্পদের পরিমাণ ত্রিশ মিলিয়ন ডলার বা তারচেয়েও বেশি। বাংলাদেশে কোটিপতি বা এই অতিধনীদের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। অর্থনীতির আকারের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে ধনী শ্রেণীর সম্পদ বাড়ার বিষয়টি উঠে আসছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যে।
যদিও ভিন্ন চিত্র দেশের ব্যাংকগুলোতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের জুন শেষে দেশে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত আছে, এমন ব্যক্তিশ্রেণির ব্যাংক হিসাব ছিল মাত্র ১০৪টি। যেখানে এর এক বছর আগে ২০২৪ সালের জুনেও বড় অঙ্কের আমানত থাকা এ ধরনের ব্যাংক হিসাব ছিল ২২৩টি।
দেশের ব্যাংকগুলোতে যখন অতিধনীদের আমানত কমে যাচ্ছে, ঠিক তখন বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রকাশিত বার্ষিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংক হিসাবে স্বীকৃত ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের জমাকৃত আমানত বেড়েছে।
২০২৪ সাল শেষে গোপন অর্থের প্রধান গন্তব্য সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশীদের জমা করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ৮৮৬ সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। অপরদিকে, দেশে অতিধনীদের পাশাপাশি ১ কোটি টাকার বেশি আমানত জমা আছে, ব্যক্তিশ্রেণীর এমন হিসাব সংখ্যাও দেশের ব্যাংকগুলোতে খুব বেশি নয়।
দেশ হিসেবে অতিধনীদের শীর্ষস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ৭৯,৫৯৫ জন অতি ধনীর বাস। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান। সেখানে ১৭,৯৭৫ জন অতি ধনী রয়েছে। এরপর চীন, জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইটজারল্যান্ড এবং দশম স্থানে রয়েছে ইতালি।
তবে একটি দিক দিয়ে বাংলাদেশ উপরে স্থান পেয়েছে। সেটি হলো অতি ধনী মানুষের সংখ্যা দ্রুতহারে বাড়ার তালিকা। এই তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে। ওয়েলথ এক্স-এর তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে ১৭ দশমিক তিন শতাংশ হারে অতি ধনীর সংখ্যা বাড়ছে। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন। তাদের বৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর আছে ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং এবং আয়ারল্যান্ড।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অতিধনীদের বড় অংশ ব্যাংকে টাকা রাখেন না। আমানত হিসাবে টাকা না রেখে তারা জমি বা বাড়ি ক্রয়ের পাশাপাশি অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেন। ধনিক শ্রেণির একটি বড় অংশ আবার উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে দেয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকে জমাকৃত অতিধনীদের অর্থের পরিমাণ কিছুই নয়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন ৪৭৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ। এখানে ধনী-গরিবের সম্পদের বৈষম্যও প্রকট। কিন্তু আমরা ব্যাংক হিসাবের যে তথ্য দেখছি, তাতে সেটির বহিঃপ্রকাশ নেই। এত বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যক্তিশ্রেণীর মাত্র ১০৪টি ব্যাংক হিসাবে ২৫ কোটি টাকার বেশি থাকবে—এটি অবিশ্বাস্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘সম্পদশালীদের অনেকের আয় বৈধ হলেও সেটি আয়কর রিটার্নে দেখানো হয় না। আর আয়ের উৎস অবৈধ হলে তারাও ব্যাংক এড়িয়ে চলেন। নগদ টাকা না রেখে সম্পদশালীরা বাড়ি বা জমি কেনেন, স্বর্ণ বা ডলার কিনেও নিজেদের কাছে জমা রাখেন। কেউ কেউ বিদেশে পাচার করেন।’
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কেবল বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ধনীরা ব্যাংকে একত্রে বেশি টাকা জমা রাখেন না। টাকা থাকলে টাকা লগ্নির বিভিন্ন পন্থা তৈরি হয়।



