বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই খাতে গত ৩ যুগ ধরে কোন সংস্কার করা হয়নি। দেশে কৃষিজমি ক্রমেই কমছে। কৃষিতে ব্যবহৃত জমির বড় অংশ উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে দিন দিন ঝুঁকি বাড়ছে এই খাতে।
কৃষিতে অপার সম্ভাবনা থাকলেও সবশেষ ১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালের পর এই খাতে কোন সংস্কার অথবা পর্যালোচনাও হয়নি। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার জন্য উদ্দ্যোগ দেখা যায়নি কোন সরকারের আমলে। ফলে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কৃষিজমি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
এদিকে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকের আয় বাড়ছে না। এর বড় কারণ, কৃষি উপকরণে বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরতা। এছাড়া যান্ত্রিকীকরণে দেশের কৃষক পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি কমছে, বিপরীতে খাদ্যশস্য আমদানি বাড়ছে।
গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, দেশে প্রতিবছর যে হারে কৃষিজমি কমছে, তাতে ১০ বছরের মধ্যে কৃষিজমির সংকট চরম আকার ধারণ করবে। এতে হুমকির মুখে পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষিপণ্যের জন্য বিদেশনির্ভরতা বাড়বে। দেউলিয়া হয়ে শহরমুখী হবে কৃষকরা। মানুষের চাপ বাড়বে নগরীর ওপর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে আবাদি জমি ১৯.৮৩ লাখ একরে নেমে এসেছে, যা আগে ছিল ২০.০৮ লাখ একর। অর্থাৎ, মাত্র তিন বছরে আবাদি জমি কমেছে ১ শতাংশ, যা গত এক দশকে সর্বোচ্চ হ্রাসের ঘটনা।
এ ছাড়াও নতুন আবাসন নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরি, শিল্পকারখানা স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে ফসলি জমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। যার বিরূপ প্রভাব গিয়ে পড়ছে সরাসরি কৃষি ও কৃষকের ওপর।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চমূল্যের ও টেকসই কৃষির দিকে এগোচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ পুরোনো কাঠামোগত সমস্যায় আটকে রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে কৃষি সংস্কারের কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলেও গত ৩৫ বছরে এ খাতে আর কোনো বড় ধরনের পর্যালোচনা বা সংস্কার করা হয়নি।
সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পরও কৃষি খাত সংস্কারে আলাদা কমিশন গঠিত না হওয়ায় এ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ সাত্তার মণ্ডল বলেন, শিল্পায়নের কারণে কৃষিজমি আরও কমবে। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তবে আমাদের মতো দেশে কৃষিজমি রক্ষায় সরকারের আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৪’ শীর্ষক বিবিএসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশের ২ শতাংশ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। দেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়া বন্ধ করতে না পারলে বিদেশি নির্ভরতা ছাড়া সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনেক বছর আগে ইউএনডিপি এবং বাংলাদেশ সরকারের তত্ত্বাবধানে কৃষি খাতের রিভিউ করা হয়েছিল। এবার যখন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, তখন আমরা আশা করেছিলাম যে কৃষি সংস্কারেও কমিশন হবে কিন্তু তা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, ১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালে কৃষি খাতে পর্যালোচনা হয়েছে। এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। এ সময়ে কৃষির অনেক রূপান্তর হয়েছে। কাজেই পরিবর্তনগুলো ধারণ করার জন্য একটা সংস্কার কমিশন দরকার ছিল।
কৃষির অন্যতম ভিত্তি উপাদান বীজ। তবে বীজের বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বীজ বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, পাটের বীজ ৭০ শতাংশের ওপর, ভুট্টা প্রায় ৯০ শতাংশ, সবজি ৬০ শতাংশ, হাইব্রিড ধান ২০ শতাংশ, তেলবীজ ও মসলার বীজের ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। বীজের আমদানিনির্ভরতা কমাতে না পাড়লে কৃষিখাত শক্তিশালী হবেনা।
কৃষি সংস্কার কমিশন গঠিত না হওয়া বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারকে প্রায়োরিটির ভিত্তিতে সংস্কার কমিশনগুলো করতে হয়েছে। যেগুলো ইমিডিয়েটলি করা দরকার ছিল।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর সব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের ডেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের জন্য চিন্তা করতে। এর অংশ হিসেবে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। সরকার এ খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।



