নিজস্ব প্রতিবেদক
গণঅভ্যুত্থানের পর মাঠের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হয়ে এখন অনলাইন প্লাটফর্মে কার্যক্রম চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলের এই ক্রান্তিকালে কর্মী-সমর্থকের খোঁজখবর না রাখলে দলটি আরও নিঃস্ব হয়ে পড়ার শঙ্কায় সবাইকে টেলিগ্রামে যুক্ত করা হচ্ছে।
দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ নেতাকর্মীর নামে মামলা থাকার কারণে তারা বেশিরভাগই এলাকা ছাড়া। ফলে তাদের কার্যক্রম এখন অনলাইনকেন্দ্রিক।
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ করে আলোচনা-সমালোচনায় সক্রিয় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা রাখতে গ্রুপগুলোতে শেখ হাসিনার রায়সহ সমাজের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ঝটিকা মিছিল নিয়ে আলোচনা হয়।
সূত্র জানায়, দিনশেষে রাতে সবাই যুক্ত হন গ্রুপগুলোতে। কর্মী-সমর্থকদের সুবিধা-অসুবিধার আলোচনাসহ অন্তর্বর্তী সরকার, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির কার্যক্রম নিয়ে নানা ব্যঙ্গ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে রাত্রিকালীন অনলাইন ‘আড্ডায়’।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে টেলিগ্রাম প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে দলটির মূল সাংগঠনিক মাধ্যম। বিভিন্ন গ্রুপে প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভার্চ্যুয়াল বৈঠক চলে। কোনো কোনো গ্রুপে সদস্যসংখ্যা ২০ থেকে ৩০ হাজারের বেশি।
এই বৈঠকগুলোতে কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য, বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা যুক্ত থাকেন। এমনকি শেখ হাসিনাও মাঝে মাঝে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন। তবে বিস্ময়করভাবে, কে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন- তা নির্ধারণে অর্থ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে (গ্রাম এলাকা) আগে থেকেই ধারণা ছিল। প্রচলিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো থেকে বেরিয়ে এখন নতুন করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যুক্ত হচ্ছেন টেলিগ্রামে। দেশের গোয়েন্দাসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি উপজেলার ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, ‘কর্মী-সমর্থকদের খোঁজখবর, সুবিধা-অসুবিধা নিতেই টেলিগ্রামে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়। দলের ভালো সময়ে কর্মীদের পাশে থাকার চেয়ে খারাপ সময়ে তাদের পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ’।
তিনি আরো বলেন, ‘কর্মী-সমর্থকদের খোঁজ নেওয়ার মধ্যেই দলকে চাঙ্গা রাখা হচ্ছে। আর আওয়ামী লীগ করা কোনো পাপের কিছু নয়। দলের খারাপ সময় ভালো সময় আসবে। দলকে ভালোবাসতে হলে সবার আগে কর্মীদের খোঁজ নেওয়া জরুরি বলে মনে করি।’
গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে মাঠে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা টেলিগ্রামে যোগাযোগ শুরু করেন। গ্রুপ করে সক্রিয় হন দলটির সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা, কেন্দ্রীয় নেতারা ও মহানগরীর নেতারা।
এ ছাড়া দলটির অঙ্গসংগঠনেরও বিভিন্ন সক্রিয় গ্রুপ ছিল টেলিগ্রামে। এবার সেখানে গ্রামের নেতাকর্মীরাও সক্রিয় হচ্ছেন। একজন থেকে দুজন, দুজন থেকে চারজন এভাবে এলাকাভিত্তিক সব কর্মীদের টেলিগ্রামে যুক্ত হতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময়ে কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। এখন তৃণমূলদেরও এ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হচ্ছে। টেলিগ্রাম অনেক নিরাপদ হওয়ায় এ মাধ্যমটি বেছে নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তবে পুলিশ বলছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নজর রয়েছে তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সাইবার টিম সবসময় অ্যাকটিভ রয়েছে। নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর অনলাইন-অফলাইন যেকোনো কার্যক্রমেই আমাদের একাধিক টিমের নজর রয়েছে।’



