নিজস্ব প্রতিবেদক
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দাবিতে চলা আন্দোলনে শিক্ষকদের লাভ হলেও ক্ষতির মুখে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা এবং কারিগরি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের আন্দোলন, কর্মবিরতি ও শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের এ অপুরণীয় ক্ষতি হয়।
দেশের শিক্ষার্থীদের এই সংখ্যাটা প্রায় দুই কোটির মতো। বর্তমানে যারা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আছে তাদের বড় অংশের মধ্যেই করোনাকালীন শিখন ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে আবার শিক্ষকদের আন্দোলন ও কর্মবিরতি! ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠে মনোযোগ হারাচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।
বিভিন্ন ধারার এসব শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোচিং বা অনলাইন ক্লাসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ঝড়ে পড়ার হার বেশি বলে সরকারি এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এর জন্য বাল্যবিবাহ প্রবণতা অন্যতম দায়ী বলে উল্লেখ করছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা।
এদিকে ‘সহকারী শিক্ষক’ পদটিকে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত করাসহ চার দফা দাবি মেনে না নেওয়ায় কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। আগামী সপ্তাহের শুরু থেকে কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। তবে তার সমাধানের প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত যাতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
বেতন বৃদ্ধিসহ তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাদের দাবি পূরণ না হলে সামনের বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করে সব বিদ্যালয় শাটডাউনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এর আগে গত ১২ অক্টোবর থেকে টানা এক মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করেন স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা।
একই চিত্র মাধ্যমিকেও, এমপিওভুক্তির দাবিতে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে রাজধানীতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ডিসেম্বর থেকে কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন চার দফা দাবিতে।
অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষকরা আন্দোলনে থাকলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। করোনাকালীন যে শিখন ঘাটতি, এখনো অনেক শিক্ষার্থী সেটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরপর অভ্যুত্থানসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সময়ে বন্ধ ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এ অধ্যাপক বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের ক্ষতি পুশিয়ে উঠতে না উঠতেই নানা দাবিতে শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ছে। বিশেষত যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে ছিলেন, সেগুলোর শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি ক্ষীতগ্রস্ত হয়েছে।’
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন বলেন, ‘এ অবস্থার জন্য সরকার দায়ী। আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না। আমাদের একজন সহকর্মী আন্দোলনে এসে পুলিশের হামলায় মৃত্যুবরণ করেছেন, দেড় শতাধিক আহত হয়েছেন। এরপরও আমরা সরকারের ওপর আস্থা রেখে অপেক্ষা করেছি।
তিনি আরো বলেন, সরকারেরর আশ্বাসে ক্লাসেও ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু ১৩ দিন পার হয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে আমরা আবার কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছি।’
শিক্ষার্থীদের ওপর আন্দোলনের প্রভাবের বিষয়ে অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষকরা আন্দোলনে থাকলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষত পরীক্ষার আগমুহূর্তে বা পরীক্ষার মধ্যে শিক্ষকরা আন্দোলন করলে এর প্রভাব আরো বেশি পড়ে।
তিনি বলেন, দেশে শিক্ষায় নানা সংকট রয়েছে, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধায় ঘাটতি আছে। তাদের দাবিগুলোও অযৌক্তিক নয়। তবে এসব দাবি-দাওয়া আলোচনার মাধ্যমেও সমাধান করা যেত।
তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা শিক্ষকদের একের পর এক যে আন্দোলনগুলো দেখছি তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে কেউই শিক্ষার্থীদের কথা ভাবছে না এবং মূলত ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরাই হচ্ছে।



