― Advertisement ―

ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে ছাত্র জোটের বিক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে রেল কানেকটিভিটি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির প্রতিবাদে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে...

দেশে খেলাপি ঋণের হার পৃথিবীর সর্বোচ্চ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ব্যাংকিং খাত এখন শুধু আর সঙ্কটে নেই- এটি একটি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় লুটপাটের পরিসংখ্যানগত প্রমাণে পরিণত হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি কোন সাধারণ ব্যাংকিং ব্যর্থতা নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত অর্থনৈতিক অপরাধের ফলাফল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। মাত্র ছয় মাসে এই অঙ্ক বেড়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা- প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৫৩ শতাংশ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের যে হার, সেটি এখন গোটা বিশ্বে সর্বোচ্চ। যুদ্ধবিদ্ধস্ত কোনো দেশের খেলাপি ঋণও ৩০ শতাংশের বেশি পাওয়া যায়নি। অথচ বাংলাদেশের ৩৫.৭৩ শতাংশই খেলাপি।

বিনিময় হারে চরম অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনৈতিক নানা সংকটে থাকা এশিয়া, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর খেলাপি ঋণের হার এখন নিম্নমুখী। যেমন তুরস্কের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ২ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

এক দশক আগে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ইউরোপের দেশ গ্রিসের খেলাপি ঋণের হার এখন ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থানীয় মুদ্রার রেকর্ড পতনের মুখে থাকা আর্জেন্টিনার ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। যেখানে চলতি সহস্রাব্দের শুরুতেও লাতিন আমেরিকার দেশটিতে খেলাপির হার ২০ শতাংশের বেশি ছিল।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বহু গুণ বেশি। এ অঞ্চলে কেবল শ্রীলংকার খেলাপি ঋণের হারই কিছুটা বেশি—১২ দশমিক ৬ শতাংশ। যদিও অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশটি তিন বছর আগে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছিল।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কার্যত একটি লুটের যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। বিশেষত একটি গোষ্ঠী- এস আলম গ্রুপ- বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে তুলে নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দেখা যায়, বহু বছর ধরে বাস্তবে খেলাপি থাকা ঋণগুলোকে কৃত্রিমভাবে ‘মানসম্মত’ দেখানো হচ্ছিল। পুনঃতফসিলের নামে চালানো হয় একটি প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতি ব্যবস্থা।

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো প্রভিশন ঘাটতি। সেপ্টেম্বর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে যে নিরাপত্তা তহবিল থাকার কথা, তার বড় অংশই নেই।

অর্থনীতিবিদরা একে বলছেন, ‘কাগজে ব্যাংক চলে। বাস্তবে বহু ব্যাংক ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছে। এই সঙ্কটের পেছনে কাজ করেছে একটি রাজনৈতিক-ব্যবসায়ী-আমলা সিন্ডিকেট।’

গতকাল বুধবার (২৬ নভেম্বর) দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

গত বছরের ডিসেম্বর শেষেও ব্যাংক খাতে খেলাপি হওয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। ওই সময় বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশ খেলাপি ছিল। সে হিসাবে মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোয় ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

গত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে তা নজিরবিহীন। আর খেলাপি ঋণের যে হার দাঁড়িয়েছে, সেটি গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘অতীতে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ “‍কার্পেটের নিচে” চাপা দিয়ে রাখত। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাবশালীদের দেওয়া ঋণ খেলাপি দেখানো হতো না।’

তিনি বলেন, ‘গত এক বছরে কার্পেটের নিচে চাপা দেয়া খেলাপি ঋণ বের হয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেষ্টা ছিল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করা। এখন আমরা প্রকৃত চিত্র জানতে পেরেছি। আশা করছি, আগামীতে খেলাপি ঋণ কমতে শুরু করবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ভেঙে দেওয়া হয় অন্তত ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা হয়।

সবচেয়ে বেশি অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামীতে আরো কয়েকটি ব্যাংক একীভূত কিংবা অবসায়নের কাজ এগিয়ে চলছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগে যে অসংখ্য ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো বা গোপন রাখা হয়েছিল, সংস্কারের ফলে সেগুলো এখন প্রকাশ পাচ্ছে। এ কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ বেশি দেখাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে বহু গ্রাহকের সম্পদ জব্দ করা হচ্ছে, শেয়ার আটকানো হচ্ছে। এসব উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। সংস্কার বাস্তবায়নে সফল হলে ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার হবে এবং ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণও কমে আসবে।’