নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আগুন লেগে হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বস্তিটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলেও এতে হাজারো মানুষ গতকাল রাতে শীতের মধ্যে খোলা মাঠে, গাছের নিচে গৃহহীন অবস্থায় রাত কাটিয়েছেন।
কড়াইল বস্তিতে আজ সকালে গিয়ে দেখা যায় আগুনের ধ্বংসাবশেষ। যা দেখলেই বোঝা যায় কিভাবে ভয়ানক আগুন শেষ করে দিয়েছে হাজারো মানুষের বসতি, বিলীন হয়ে গিয়েছে তাদের বহু বছর ধরে বোনা স্বপ্ন।
অগ্নিকাণ্ডে সব হারিয়েছেন লাভলী বেগম। সাত বছর ধরে কড়াইল বস্তিতে বসবাস তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাভলী বললেন, ‘আগুন আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। কিস্তিতে কেনা জিনিসপত্র, কিছু জমানো টাকা, কাপড় সব কিছু পুড়ে গেছে। বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমাব কোথায় জানি না। আমরা একটু সাহায্য চাই, পোলাপান নিয়ে থাকার জন্য নিরাপদ একটু আশ্রয় চাই।’

দুই মাস আগে কড়াইল বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন দিনমজুর শামসুল ইসলাম। গতকালের আগুনে সব হারিয়েছেন তিনিও। শামসুল বলেন, ‘আগুন এত তীব্র ছিল যে আমরা কোনো জিনিসই রক্ষা করতে পারিনি। চারিদিক ধোঁয়া আর আগুনে ঘিরে আমাদের বের হতে অনেক কষ্ট হয়েছে।’
কীভাবে রাতে কাটল জানতে চাইলে শামসুল বলেন, ‘আমরাতো বড় মানুষ, আমাদের নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে বাচ্চাদের নিয়ে। আমার বাচ্চারা তার ফুফুর সঙ্গে খামারবাড়ি মাঠের পূর্ব পাশে এক জায়গায় বিছানা করে শুয়ে ছিল। এভাবেই রাত কেটেছে তাদের।’
গতকাল রাত ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০টি ইউনিট কাজ করছে। যানজটের কারণে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়। ফলে আগুন নেভানোর কাজ দেরিতে শুরু হয়।
তাজুল ইসলাম বলেন, সরু গলিপথ ও ঘনবসতিপূর্ণ আবাসনের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভাতে সমস্যার সম্মুখীন হন। সরু গলির কারণে তারা ইঞ্জিনগুলো দূরে রেখে লম্বা পাইপ টেনে আগুন নেভাতে বাধ্য হন। এছাড়া উৎসুক জনতার ভীড়ের কারণে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কাজ করতে বেগ পেতে হয়েছে।

অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুনে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আগুন লাগার কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা যায়নি।
বস্তিতে এর আগেও বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সর্বশেষ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ২২ ফেব্রুয়ারি, সেই সময় বস্তির কমপক্ষে ৬০টি ঘর পুড়ে গিয়েছিল।
অগ্নিকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক ঘর পুড়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ডে যেসব পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট আমাদের সকলের বেদনার। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে।’
প্রসঙ্গত, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীর পাশে প্রায় ১৬০ একর জমিতে গড়ে ওঠে কড়াইল বস্তি। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এ বস্তি প্রসার লাভ করে। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর দেশের বিভিন্ন এলাকার হতদরিদ্র মানুষ এ বস্তিতে আশ্রয় নিলে এটি বিশাল আকার ধারণ করে।



