নিজস্ব প্রতিবেদক
আর কয়েক মাস পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ প্রশাসনে চলছে ব্যাপক রদবদল। ভোটের সময় পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বিভন্ন সময় প্রশ্নও তুলেছেন। তাদের বক্তব্যের মূল বিষয়ে হচ্ছে, পছন্দের পুলিশ যথা সময়ে যথা স্থানে পদায়ন করানো। এই নিয়ে ইতোমধ্যেই টানা-হ্যাচড়া শুরু হয়ে গেছে।
এদিকে সরকারের পক্ষথেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, সুষ্ঠু ভোটের প্রশ্নে পুলিশ নিরপেক্ষ থাকবে। সরকার চেষ্টা করছে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা দফায় দফায় বৈঠকও করছেন। ঢেলে সাজানো হচ্ছে পুলিশকে।
নির্বাচন সামনে রেখে রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের রদবদল করার পরিকল্পনা নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, পুলিশের বদলি করা নিয়ে রশি টানাটানি শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে ‘পছন্দ-অপছন্দ’ ‘পক্ষ-বিপক্ষ’। গত শনিবার (২২ নভেম্বর) জরুরি এক বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পরও এ নিয়ে কোনো সমাধান করা যায়নি। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশ প্রশাসনে রদবদল চায় নিজের মতো করে।
সূত্রটি আরো জানায়, পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ এসব রদবদলের জন্য শনিবারের বৈঠকে বসেন কয়েকজন উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারী, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ মন্ত্রণালয় ও পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। প্রায় তিন ঘণ্টা চলে বৈঠকটি। বৈঠকে একপক্ষ চাচ্ছে বর্তমানে দায়িত্বরত রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ওসিরা যেখানেই আছেন, তাদের সেখানেই রাখতে।
অপর পক্ষটি যাচ্ছে বদলি। তাদের যুক্তি, দেশের বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা ভালো নয়। যারা দায়িত্ব পালন করছে তারা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তফসিল ঘোষণা করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। তাদের সঙ্গে ‘স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সুসম্পর্ক’ গড়ে উঠেছে। এসব দিক বিবেচনা করে রেঞ্জ, এসপি ও থানার ওসিদের বদলি করতেই হবে। আর না হয় অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
আর যারা বদলির পক্ষে নয়, তাদের যুক্তি, জেলা বা থানায় দায়িত্ব নেওয়ার পর সোর্স তৈরি করতে হয় পুলিশের। এতে সময় লাগে। পাশাপাশি অপরাধীদের সনাক্ত ও ধরতে সুবিধা হয়। এলাকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন কর্মকর্তারা।
বৈঠকে উপস্থিত নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক সময় ধরে চলা আলোচনার পরও কোনো সমাধানে আসা যায়নি। প্রভাবশালী দুজনের মতবিরোধের কারণে সমাধান ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়। চলতি সপ্তাহেই আবারও এ কমিটি বৈঠকে বসবে।
তিনি আরো বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে জনপ্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও তদারকি করতে তিনটি কমিটি গঠন করে সরকার। তাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক এ কমিটি অন্যতম। কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও সদস্য সচিব নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন এবং সদস্য হিসেবে আছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, একপক্ষ কিছু বিষয় মানলে আরেকপক্ষ মানছে না। বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে তাও বলতে পারছি না। তবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ঘোষিত লটারিতে পুলিশে বদলির কার্যক্রম এখনো শুরু করা যায়নি। লটারিতে আর হবে কি না, তাও আমরা জানিনা।
এদিকে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা নিজে থেকেই বদলির আদেশ বাতিল করতে বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন বলে জানা গেছে। গত ১৬ নভেম্বর কয়েকজন ডিআইজিসহ পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা বদলি হলেও অনেকেই নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও এখনো তিনি বদলি হওয়া স্থানে যাননি।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি বদলির আদেশ বাতিল করার চেষ্টা করছেন। ওই কর্মকর্তার পাশাপাশি আরও কয়েকজন কর্মকর্তা তদবির করছেন বলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন। তিনি বলেন, এমন রেষারেষিতে সরকারের হাইকমান্ড এখন ভিন্নপথে এগোচ্ছে। ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় সুপারিশকৃত ২৭ ও ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের এসপি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ, এ দুই ব্যাচে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ক্যাডারের সংখ্যা অনেক কম বলে অনেকেই মত দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সবাই খোলামেলা কথা বলেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ বলেন, পুলিশের ভেতর এই দলবাজির সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটা সব সরকারের আমলেই ছিল। আওয়ামী লীগ আমলে এক পুলিশের ভেতরই ১০ থেকে ১২টি গ্রুপ সক্রিয় ছিল। ওইসব গ্রুপের নেতারা কারও নির্দেশই মানতেন না।
তিনি বলেন, বর্তমানে যারা দলবাজি করছেন, তারাও একসময় চরম অবহেলিত ছিলেন। তাদের দিনের পর দিন প্রমোশন ও পোস্টিং দেওয়া হয়নি। এখন হয়তো তাদের চাকরির সময় আর অল্প সময় আছে। এ কারণে তারা ভালো পোস্টিং ও প্রমোশনের জন্য কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিচ্ছে।
পুলিশসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশে ভালো পদে পদায়ন হতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তা। এজন্য তারা নিয়মিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। এমনকি রাজনৈতিক মতাদর্শের সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের দপ্তরেও নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। সম্প্রতি পুলিশে বড় রদবদলের পর আবারও বদলির কানাঘুষা শুরুর পর এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এমনকি ভালো পদ পেতে টাকা লেনদেনের অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে।
গত বছর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনার পর পুলিশের সংস্কারের বিষয়টি সামনে আসে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। পাশাপাশি বেশ কিছু সংস্কারের কথাও বলা হয়েছে।
এর মধ্যে পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি পুলিশ কমিশন গঠন করে কমিশনের অধীনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারাও চান পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি কমিশনের অধীনেই হোক। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারাও পুলিশ কমিশন গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে অভ্যুত্থানের পর এখনো পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত সরকারের ছত্রছায়ায় একশ্রেণির দলবাজ, লাইনবাজ, ঘুষখোর পুলিশ কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য হয়েছে। আমরা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আর ব্যবহৃত হতে চাই না। এ থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। প্রতিষ্ঠিত নিরপেক্ষ বডি কিংবা কমিশনের মাধ্যমে পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি দেওয়া হলে জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী হবে এবং দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ থাকবে না বলে মনে করেন তারা।
এদিকে থানার ওসিদের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। চলতি বছরের ৩ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আইজিপি বাহারুল আলম স্বাক্ষরিত নীতিমালাটি বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের সব ইউনিট প্রধানের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুসারে, শুধু সেসব কর্মকর্তাকেই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য বিবেচনা করা হবে, যারা কমপক্ষে তিন বছর পরিদর্শক হিসেবে কাজ করেছেন এবং একটি থানা ব্যবস্থাপনা কোর্স সম্পন্ন করেছেন।
৫৪ বছরের বেশি বয়সী কর্মকর্তারা এ পদের জন্য অযোগ্য হবেন, যেখানে এইচএসসি বা উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্নদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। চাকরির যেকোনো সময় আর্থিক অনিয়ম বা নৈতিক স্খলনের জন্য শাস্তি পেলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এ পদের জন্য অযোগ্য হবেন। যদি কোনো কর্মকর্তা পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত থাকাকালে দুবার বা তার বেশি শাস্তি পান বা এর আগে তিনবার বা তার বেশি গুরুতর অপরাধের জন্য শাস্তি পেয়ে থাকেন, তবে তাকে নির্বাচনের জন্য বিবেচনা করা হবে না।
তাছাড়া নির্বাচনের এক বছরের মধ্যে ছোট অপরাধের জন্য অথবা দুই বছরের মধ্যে গুরুতর অপরাধের জন্য শাস্তি পেলে একজন কর্মকর্তা পদের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। টানা পাঁচ বছর তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) গড়ে ৮০ নম্বর পেতে হবে এবং টানা তিন বছর ধরে মূল্যায়নকারীদের কাছ থেকে এসিআরে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য থাকা যাবে না।



