নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ছাত্রাবাসগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। বহু বছর আগে নির্মান করা এসব জড়াজীর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা করছেন শিক্ষার্থীরা। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতেও ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। গত শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।
দেড় বছর আগে সরকারি – বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৪ টি ‘ অতি ঝুঁকিপূর্ণ ‘ ভবন সাতদিনের মধ্যে খালি করে সিলগালা কিংবা ভেঙে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ( মাউশি ) অধিদপ্তর ।
রাজউকের সুপারিশের ভিত্তিতে জারি করা নির্দেশনাটি এখনো শুধু কাগজেই রয়ে গেছে । এতে হাজারো শিক্ষক – শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই দিনে চারটি ভূমিকম্পে দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে । এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অতি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার ৪৪ টি ভবন দ্রুত বন্ধ না করলে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে পুরাতন হলগুলোর একটি। গত কয়েক বছর ধরে বারবার সংবাদ শিরোনাম হয়ে আসছে এটি হলটি। এখানে করিডর, পুরোনো ব্লক ও একাধিক কক্ষে বড় ফাটল দেখা গেছে, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে, এমনকি কোথাও কোথাও লোহার রড বের হয়ে আছে।
শুধু তাই নয়, সলিমুল্লাহ হলে কয়েক মাস আগে একাধিক কক্ষে প্লাস্টার খসেপড়ে শিক্ষার্থীরা আহত হন, যা প্রশাসনের প্রতি শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এছাড়া ১৯৬৭ সালে নির্মিত হাজী মুহসীন হলও একই দুরবস্থায় রয়েছে। হলের ক্যান্টিন, সিঁড়ি ঘর এবং বিভিন্ন ব্লকে ফাটল, মেঝের ফাটল এবং দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া এখনে নিয়মিত ঘটনা।
বাংলাদেশ‑কুয়েত মৈত্রী হলের ভবনগুলো কাঠামোগত এবং আবাসনগত সমস্যায় জর্জরিত। ২০০৬ সালে সেই ভবনটি প্রকৌশল শাখা কর্তৃক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও হাজারো শিক্ষার্থী এখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।
এ ছাড়া ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের একই অবস্থা। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কবি জসীম উদ্দীন হল সম্প্রতি আলোচনায় আসে ৩২৪ নম্বর কক্ষে হঠাৎ করে দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে এক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায়। এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটলেও সংস্কারের কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছেনা বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এ ছাড়াও ফজলুল হক মুসলিম হল, সুর্যসেন হল এবং জহুরুল হক হল-প্রতিটি হলের দেওয়ালে দীর্ঘ ফাটল সৃষ্টি, পুরোনো পাইপলাইনের কারণে কক্ষ ও করিডরে পানি জমে থাকা এবং অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

হাজী মুহসীন হল সংসদের জিএস রাফিদ হাসান সাফওয়ান বলেন, রাতে আকস্মিকভাবে ছাদের অংশ খসে পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের বড় অংশই মেয়াদোত্তীর্ণ বা অকার্যকর হওয়ায় যে কোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
শহীদুল্লাহ হলের শিক্ষার্থী ইব্রাহীম খলিল জানান, কেউ আধঘুমে, কেউবা সবে ঘুম থেকে উঠেছে, কেউ নিত্য কাজকর্মে ব্যস্ত। হঠাৎ করেই এমন সময় ভূমিকম্প আঘাত হানে। সবার মাথায় একটাই আতঙ্ক, আমাদের এই ফিটনেসবিহীন ভবন সামান্য ঝাঁকুনিতেই ধসে পড়তে পারে। সাধারণ অবস্থাতেই কয়দিন পরপর ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। তাই প্রাণ বাঁচাতে যে যেভাবে পেরেছে, দৌড়ে বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে আসার চেষ্টা করেছে।
তিনি আরো বলেন, গত পরশু বুয়েটের এক ভাইয়ের ফেসবুক পোস্টে দেখলাম, তাদের হলগুলোর ফিটনেসবিহীন ভবনের বেহাল অবস্থার কথা। ঢাকা মেডিকেলের ফজলে রাব্বী হলও নাকি একই রকম ভাঙাচোরা। ঢাবি, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেলের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে সার্বিক চিত্র বুঝতে আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন হয় না।
মুহসীন হলের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান হিমেল বলেন, নীতিনির্ধারকদের কবে ঘুম ভাঙবে কে জানে? আরেকটা অক্টোবর ট্র্যাজেডি (ঢাবির জগন্নাথ হলে ভবন ধসে ৪০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা) ঘটলে? ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়লে তখন আর ৩০-৪০ জন নয়, একসঙ্গে শত সহস্র শিক্ষার্থী প্রাণ হারাবে।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে লাফিয়ে পড়ে আহত হওয়া শিক্ষার্থী তানজির আহমেদ জানান, ভূমিকম্পের সময় তার মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না, তবে মাথায় ছিল যে এ সময় হলে থাকাটা তার জন্য মোটেও নিরাপদ না।

হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের ভিপি সাদিক হোসেন শিকদার বলেন, আমাদের হল ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করে, শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে সবচেয়ে অবহেলিত।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রশাসনের জরুরি দায়িত্ব। ভবিষ্যতে যদি আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, এর সম্পূর্ণ দায় তাদের নিতে হবে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে। একইসঙ্গে নতুন হল নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের যথাযথ সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য জানার জন্য উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দায়সারা জবাবে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্প ছাড়াও যে কোন সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কেউ কেউ বলছেন , মাউশি ভবন সিলগালা অথবা ভেঙে ফেলার নির্দেশনা দিলেও তা করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানোর বিকল্প কোনো উপায় নির্ধারণ না হওয়ায় নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না । আবার কেউ বলছেন , এমন নির্দেশনার কথা তাঁরা এখনো জানেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো নাজুক পরিস্থিতির কারণে আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আজ রবিবার বিকেল ৫টার মধ্যে আবাসিক হলসমূহ খালি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।



