নিজস্ব প্রতিবেদক
গত এক দশকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিপুল ব্যয়ের সুফল দৃশ্যমান নয়।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে- যেমন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন না করেই সম্মানী-ভাতা উত্তোলন, স্বাক্ষর জাল করা, বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ লোপাট, ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাত।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ৩ হাজার কোটি এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষকের (সিএজি) কার্যালয়ের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদন বিশ্লেষন করে দেখা যায়, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আওতাধীন পরিচালক সিভিল এভিয়েশন একাডেমির ঢাকা কার্যালয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাস্তবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা না করা সত্ত্বেও প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানী ও ভাতা বাবদ ব্যয় দেখানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রশিক্ষণের নামে সরকারের অর্থ অপচয়ের কারণে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা ও তার কমিশনের সদস্যসহ একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের এক জনমত জরিপেও ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে প্রশিক্ষণের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপে দেড় লাখ মানুষের কাছ থেকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশ, ভূমি, আয়কর অফিস, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল ও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত বিষয়ে মতামত নেয়া হয়।
প্রাপ্ত মতামত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি এসব সেবা নিয়ে মানুষের অনেক অভিযোগ রয়েছে। জরিপ অনুসারে, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে শতভাগ সেবাগ্রহীতা অসন্তুষ্ট। ৫০ শতাংশ মানুষের মতে, ঘুস-দুর্নীতি ছাড়া পুলিশের সেবা পাওয়া যায় না। ৮৪ শতাংশ মানুষ জনপ্রশাসন সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশের বিদ্যমান প্রশাসন ব্যবস্থা জনবান্ধব নয়।
এছাড়াও ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেন, সরকারি কর্মচারীরা নাগরিকদের সঙ্গে শাসকের মতো আচরণ করেন। ৯৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে এবং ৪২ শতাংশ মানুষের মতে, বিদ্যমান সব সমস্যার মূলে রয়েছে দুর্নীতি।
সরকারি কর্মচারীদের সেবা নিয়ে জনসাধারণের এত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে দেওয়া প্রশিক্ষণে কতটা সুফল মিলছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের ৯-১০ লাখ কর্মচারী রয়েছে। সে হিসাবে অর্থের পরিমাণটা খুব বড় না। দক্ষতার কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে সেটা বলতে পারব না। তবে প্রশিক্ষণ না হলে যে আরো খারাপ অবস্থা হতো এটুকু বলতে পারি।’
তিনি আরো বলেন, ‘অ্যাক্টিভিটি কিংবা প্রোগ্রাম করা না হলে এবং মৌলিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কেউ বুঝতে পারবে না কীভাবে কাজ করতে হয়।’



