― Advertisement ―

নোংরা ভিউ ব্যবসায় হুমকীতে ব্যক্তিগত জীবন

মেহেদী হাসান জসীম : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিউ ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতায় হুমকীর মুখে পড়েছে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায় এ...

ছায়ার ভেতরে দীপ্তি: ইকরাম উল্লাহ চৌধুরীর নিঃশব্দ দেশপ্রেম

লেখা: অতিথি লেখক, এম জসীম উদ্দীন :

ইতিহাসের অনেক পাতাই প্রকাশ্য। অনেক নামই খচিত হয় স্বর্ণাক্ষরে। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা আলোর দিকে পা বাড়ালেও নিজেকে রাখেন ছায়ায়। তাঁরা দেশমাতৃকার জন্য যা করেন, তার গৌরব কখনো উচ্চারিত হয় না, কখনো তাদের গল্প লেখা হয় না পাঠ্যবইয়ে। তেমনই একজন মানুষ ইকরাম উল্লাহ চৌধুরী—এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, এক গেরিলা যোদ্ধা, আর পরবর্তীকালে এক নীরব মানবিক যোদ্ধা।

যুদ্ধ যখন ডাকে, কিশোর তখন সৈনিক
১৯৭১। বাংলাদেশ তখন রক্তাক্ত, অথচ প্রত্যয়ের দীপ্তিতে জ্বলন্ত। চারদিকে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। ঠিক তখনই কিশোর ইকরাম উল্লাহ সিদ্ধান্ত নেন—এই যুদ্ধ তাঁরও। বয়স তখন কেবল কৈশোর পেরিয়েছে। পেছনে ছিল না কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন, সামনের দৃশ্যপটে ছিল না কোনো ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। তবুও পাড়ি জমান সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে।

সেখানে যোগ দেন গেরিলা প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণ শেষে সনদ নিতে যান ভারতের কলকাতায় ১০ নম্বর সেক্সপিয়র সরণিতে, বাংলাদেশের তৎকালীন কম্বাইন্ড ডিফেন্স হেডকোয়াটার্সে। সেখানে তাঁর দেখা হয় জেনারেল এম এ জি ওসমানির পার্সোনাল সেক্রেটারি লেফটেন্যান্ট শেখ কামালের সঙ্গে।

তাঁর উত্তর—“আমি ২ নম্বর সেক্টরের একজন গেরিলা যোদ্ধা। আমার সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ।” এই পরিচয়ে মুগ্ধ হন শেখ কামাল। শুধু সনদ দিয়েই থেমে থাকেননি। কিশোর ইকরামকে নিজের ঘরে দু’দিন থাকার ব্যবস্থা করে দেন। নিজ গাড়িতে ঘুরিয়ে দেখান কলকাতা শহর। এমনকি ঠিকানা ও ফোন নম্বর রেখে দেন ভবিষ্যতের যোগাযোগের জন্য।

কিন্তু তখন শেখ কামাল জানতেন না, এই কিশোর যোদ্ধাই ছিলেন আরেক কিংবদন্তি—ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ছোট ভাই। আর ইকরামও নিজের এই পারিবারিক পরিচয় প্রকাশ করেননি। দেশ, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগই ছিল তাঁর একমাত্র পরিচয়।

বঙ্গবন্ধুর বুকে এক কিশোর গেরিলা
১৯৭২ সালের মে মাসে শেখ কামাল ফোন করেন তাঁদের বকশীবাজারের বাসায়। তখন ইকরাম বাড়িতে ছিলেন না। পরে তিনি শেখ কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমন্ত্রণ পান ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে—বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। সেখানে শেখ কামাল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এই কিশোর গেরিলাকে।

শেখ কামাল তাঁকে (ইকরাম উল্লাহ) দেখিয়ে বলেন, “এই কিশোর গেরিলা হিসেবে যুদ্ধ করেছে। তাঁর প্লাটুনের ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছে।” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুনেই তাঁকে বুকভরা ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরেন। তবু ইকরাম তাঁর ভাইয়ের পরিচয় তখনও দেননি। বঙ্গবন্ধু অবশ্য পরে জেনারেল ওসমানির কাছ থেকে তাঁর পরিচয় জেনেছিলেন।

নিরবতার ভেতরেই তাঁর দীপ্তি
স্বাধীনতার পর অনেকেই ফিরে যায় প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে, কেউ কেউ মেতে ওঠে ক্ষমতা বা খ্যাতির মোহে। কিন্তু ইকরাম উল্লাহ বেছে নেন নিঃশব্দে পথচলার জীবন। ১৯৮০-র দশকে তিনি পাড়ি জমান কানাডায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই সিদ্ধান্ত নেন, উচ্চাশার চেয়ে মানুষকে পাশে থাকাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

গত ৪৫ বছর ধরে তিনি বেঁচে আছেন প্রচারের বাইরে, সংবাদপত্রের হেডলাইনের বাইরে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে। নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে দেশের ও প্রবাসের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারকে সাহায্য করেছেন—কখনও সন্তানদের পড়াশোনায়, কখনও জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে। কারও মুখে নিজের নাম শোনার আগ্রহ নেই তাঁর। নিজের নামের পাশে বড় ভাইয়ের পরিচয়ও চান না—চান পরিচিত হতে একজন কিশোর যোদ্ধা হিসেবে, যিনি যুদ্ধ করেছিলেন সাড়ে তিন হাত জমির জন্য নয়, বরং একটা পতাকার আকাশমুক্ত ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উড়ালের জন্য।

এক অদৃশ্য দীপ্ত অধ্যায়ের মানুষ
ইকরাম উল্লাহ চৌধুরীর জীবন গল্প নয়, প্রতিরোধের অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেম শব্দে নয়, সাহসে ফুটে ওঠে। ইতিহাসে নয়, অন্তরে বাঁচে। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়—শৈশবের দেশপ্রেম, যৌবনের নীরব ত্যাগ, পরিণত বয়সের মানবিক হাত বাড়িয়ে দেওয়া—সব কিছু একসূত্রে গাঁথা হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায় ইতিহাসের এক অলিখিত নায়ক হিসেবে।

এই ইতিহাস কেবল স্মরণ করার জন্য নয়, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করার জন্য—যাতে আমাদের সন্তানরা একদিন জানতে পারে, যুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনের নয়, আত্মত্যাগ, আত্মনির্মাণ আর নীরব দেশপ্রেমেরও।