দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে- বিশেষ প্রতিনিধি:
করোনা মহামারির পাঁচ বছর পর, পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। এক সময় আমরা বিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছি, টিকা নিতে লাইন দাঁড়িয়েছি। এক অদৃশ্য ভাইরাস আমাদের শাসন করছিল। আমরা প্রাণপন চেষ্টা করেছি এর ধ্বংসযজ্ঞ কমাতে।
কিন্তু এখন? এখন তো পরিস্থিতি উল্টো। এখন মাস্ক পরা ব্যক্তিদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়, সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিও পুরোপুরি অবহেলিত, আর টিকার ওপর মানুষের আস্থা অনেকাংশে কমে গেছে। নতুন পরিস্থিতিতে এক নতুন বয়ান মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে—এই মহামারির জন্য ভাইরাস নয়, বরং আমাদের প্রতিক্রিয়াই দায়ী!
এই বয়ান আগে থেকেই ছিল, তবে এটি ছিল প্রান্তিক কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এখন এটি মূলধারায় ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতাদের সাফল্যের মাধ্যমে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন, এই ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলা করাটা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিডের প্রতিক্রিয়া নিখুঁত ছিল না। টিকা লাখ লাখ জীবন বাঁচিয়েছে, দ্রুত কার্যকর টিকা তৈরির প্রযুক্তি ব্যাপক উন্নতি করেছে, এবং মাস্কের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছিল।
মহামারির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সংক্রমণের শুরুতেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তাহলে বিজ্ঞানীরা কি ভুল করেছেন? অবশ্যই, কারণ তাঁরা এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তখনকার রাজনৈতিক নেতারা অনেক সময় বিজ্ঞানীদের কথা শোনেননি বা তাঁদের পরামর্শকে ভুলভাবে ব্যবহার করেছেন।
এখন আমরা দেখছি, ভুল তথ্যের বলি হয়েছেন আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউচি। একসময় যিনি যুক্তরাষ্ট্রের “সবচেয়ে বিশ্বস্ত করোনাভাইরাস বিশেষজ্ঞ” ছিলেন, এখন তাঁকে জনরোষের শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন। ব্রিটেনের বিজ্ঞানী ক্রিস হুইটি এবং প্যাট্রিক ভ্যালান্সও একই রকম হুমকির মুখে পড়েছেন।
বিজ্ঞানীদের প্রতি এমন বৈরী মনোভাব আমাদের নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর। ভবিষ্যতে আর কেউ কি এই দায়িত্ব নিতে চাইবে? এরইমধ্যে, সংক্রামক রোগ গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থ কমছে, ফলে ভবিষ্যৎ মহামারির ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক রোগ পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে।
এদিকে, সংক্রামক রোগগুলো কিন্তু আমাদের বিশ্রাম দিচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তন ও বন উজাড়ের কারণে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার হার বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের পরবর্তী মহামারি খুব কাছেই হতে পারে, এবং সম্ভাব্য হুমকিগুলোর মধ্যে আছে বার্ড ফ্লু । এটি এখনো মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটায়নি, কিন্তু এটি বহুবার প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে এবং প্রাণহানিও ঘটিয়েছে। যদি এটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে কোভিডের মতোই মারাত্মক বা তার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
ভবিষ্যত মহামারি ঠেকানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো. আমাদের সমাজকে আরও সহনশীল করে তোলা। কোভিড মহামারির সময় আমরা দেখেছিলাম যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, বৈষম্য কমানো এবং সামাজিক সংহতি বাড়ানো কতটা জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই শিক্ষা আমরা খুব দ্রুতই ভুলে গেছি।
২০২১ সালে ৭০টি দেশের মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অনুভব করেছিল যে, সরকার তাদের সত্যিকারের যত্ন নিচ্ছে না। রোগের পরিসংখ্যান আর সংক্রমণের হার নিয়ে আলোচনার মধ্যে তাদের দৈনন্দিন সংগ্রামের বিষয়টি হারিয়ে গিয়েছিল। অসুস্থ হলেও অনেকেই কাজে যেতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ ছুটি নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না।
বিপদের সময় প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র সবাইকে রক্ষা করতে পারে না—মানুষকেই একে অপরকে সাহায্য করতে হয়। মহামারির সময় যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ পারস্পরিক সহায়তামূলক কাজে যুক্ত হয়েছিল। সরকার যদি এসব উদ্যোগকে সমর্থন করত, তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারতো।
কোভিড-১৯ মহামারির পাঁচ বছর পর আমাদের একটি জাতীয় আলোচনা দরকার—সংকটকালে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত। আমাদের নিজেদের ও সমাজের প্রতি কী দায়িত্ব? আর রাষ্ট্র আমাদের প্রতি কতটুকু দায়িত্ব পালন করবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই, ভুল তথ্য ছড়ানো চিৎকার-চেঁচামেচি থামানো দরকার। কারণ, ভুল শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা ভবিষ্যতে কোনো নতুন মহামারির মুখোমুখি হই, তবে ক্ষতির মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে



