যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনার জেরে কৌশলগতভাবে অতি সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল প্রায় পুরোপুরি থমকে গেছে। আজ সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) প্রকাশিত শিপিং ট্র্যাকিং উপাত্ত অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে এই সমুদ্রপথ দিয়ে যাতায়াতকারী দৃশ্যমান পণ্যবাহী ট্যাংকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দৈনিক মাত্র পাঁচটিতে নেমে এসেছে। আক্রান্ত হওয়ার সরাসরি ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের বাণিজ্যিক জাহাজের রুট পরিবর্তন করছে কিংবা যাত্রা স্থগিত রাখছে।
নৌপথ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, সমুদ্রসীমায় বাস্তবে চলাচলকারী জাহাজের প্রকৃত সংখ্যা খাতায়-কলমে দেখানো সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে। কারণ, সম্ভাব্য সামরিক বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এড়াতে অনেক তেলবাহী ট্যাংকার তাদের অবস্থান নির্দেশক সংকেত যন্ত্র বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) বন্ধ রেখে রাতের অন্ধকারে প্রণালি পার হচ্ছে। পণ্য বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী বৈশ্বিক সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুসারে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে এই প্রণালি দিয়ে পার হওয়া হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ ছিল মূলত ছোট আকারের এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) বাহক। এর একটি ইরানের অভ্যন্তরীণ জলসীমা ঘেঁষে প্রণালি ছাড়লেও অন্যটি এআইএস বন্ধ রেখে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
এর আগে শুক্রবারও হরমুজ দিয়ে অন্তত ১৪টি জাহাজ পারাপার হয়েছিল। তার মধ্যে কাতার থেকে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলবোঝাই একটি বিশাল সুপারট্যাংকার ছিল, যেটি ট্র্যাকিং ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) নিশ্চিত করেছে, গত শনিবার প্রণালির ভেতরে চলাচলকালে অজ্ঞাত এক প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি আন্তর্জাতিক তেল ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত এক সপ্তাহে হরমুজে এটি তাদের রেকর্ড করা তৃতীয় সরাসরি হামলার ঘটনা।
সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত রোববার, যখন ইরানের কৌশলগত লারাক দ্বীপে অতর্কিত হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। এক মাসেরও বেশি সময় পর ইরানি ভূখণ্ডে এটাই ছিল ওয়াশিংটনের প্রথম বড় ধরনের বিমান হামলা। আইআরজিসি (ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী) অবিলম্বে এই হামলায় সেনা ও বেসামরিক লোক হতাহতের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিশোধের হুশিয়ারি দেয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোববার দিবাগত রাতে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার সকালে জর্ডানের সামরিক মুখপাত্র জানান, তাদের আকাশসীমায় অবৈধভাবে প্রবেশ করা অন্তত আটটি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সফলতার সাথে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাবে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট উত্তোলিত অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এভাবে টানা পথ অবরোধ ও সামরিক সংঘাত চলতে থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।



