নিজস্ব প্রতিবেদক
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুটা নিষ্ক্রিয়তার সুজোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের মাদক মাফিয়ারা। তারা দেশে নতুন নতুন মাদকদ্রব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে মাদকসেবীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, পাশাপাশি এই ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। তবে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র বলছে, মাদক মাফিয়ারা এই সর্বনাশা ব্যবসায় তরুণ শিক্ষার্থীদের বেছে নিচ্ছে। তারা নতুন মাদকদ্রব্য ‘এমডিএমএ’, যা ‘মেথালাইন ডি-অক্সি মেথ-অ্যাম্ফিটামিন’ ব্যবহার করছে।

সম্প্রতি এই নতুন মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএনসি।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের একটা অংশ শুধু মাদক সেবনই নয়, মাদক বেচাকেনার সাথেও জড়িয়ে পড়ছে। এসব শিক্ষার্থীকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে।
ডিএনসি সূত্র বলছে, তাদের কাছে ৮৫ জন মাদক মাফিয়া ও এক হাজার ২৩০ জন মাদক কারবারির পুরনো তালিকা রয়েছে। সেই তালিকাটি হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু গতকাল বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত তা হালনাগাদ করা হয়নি।
ডিএনসির ভাষ্য মতে, মাদক কারবারিচক্র তাদের ব্যবসায় বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনা থেকে শুরু করে সারা দেশের অলিগলিতে এখন হাত বাড়ালেই মাদকদ্রব্য মিলছে। গ্রামাঞ্চলেও এখন সহজলভ্য এ সব মাদকদ্রব্য।
এদিকে অনলাইনেও চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। ক্রমাগত মাদকের চাহিদা বাড়ায় প্রতিবছর দেশ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার হয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাদকসেবী বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন ডিজে পার্টিতে ব্যবহৃত হয় এমডিএমএ। বিভিন্ন অভিজাত ধনী শ্রেনীর যুবক-যুবতিদের কাছেও সরবরাহ করা হয় এই মাদক। যা বিদেশি চকলেটের আড়ালে ডাকযোগে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসে।

মাদক মাফিয়ারা আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের অংশ জানিয়ে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘এই চক্রের সদস্যরা দেশে মাদকের বড় বাজার তৈরির চেষ্টা করছে। এর মধ্যে তারা হেরোইন, আইস, কুশসহ কয়েকটি মাদকে তরুণসমাজের একটি অংশকে আসক্ত করতে পেরেছে। এখন মাদক কেনাবেচায় তারা বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতে শুরু করেছে।’
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে ডাকযোগে আসা এমডিএমএর একটি চালানসহ এই চক্রের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ৩১৭টি এমডিএমএ বড়িসহ গাঁজা ও কিটামিন উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া মাদকের মধ্যে কিটামিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে ডিএনসি বলছে, কিটামিন মূলত একটি ‘ডিসোসিয়েটিভ অ্যানেসথেটিক’ ওষুধ, যা চিকিৎসক্ষেত্রে অপারেশনের সময় অজ্ঞান করার জন্য ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে মাদক হিসেবে ব্যাপকভাবে এর অপব্যবহার বাড়ছে।

এ বিষয়ে ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মাদকচক্র কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচার করছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হিসেবে টঙ্গীর একটি কুরিয়ার সার্ভিসে অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ঢাকা থেকে ইতালিগামী একটি পার্সেল জব্দ করা হয়।
পরে সেখান থেকে তোয়ালের ভেতর থেকে দ্রবীভূত অবস্থায় ৬.৪৪ কেজি কিটামিন শনাক্ত করা হয়। জব্দকৃত পার্সেল প্রেরকের ঠিকানা, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে চাঁদপুরের মতলব উত্তর এলাকা থেকে প্রেরক মো. মাসুদুর রহমান জিলানীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘মাদক বর্তমানে সমাজের বড় সমস্যার একটি। সীমান্ত হয়ে দেশে মাদক ঢুকছে। মাদক নিয়ে ধরা পড়া কারবারির সংখ্যা বাড়ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, মাদক আসছে বেশি, ধরাও পড়ছে।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রধান ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মাদকসেবী রয়েছে।’



