বিশেষ প্রতিনিধি, বরিশাল :
জলবায়ু সংকটে সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলায় বরিশাল অঞ্চলের কৃষকদের নিজস্ব বৃদ্ধিমত্তায় উদ্ভাবিত ভাসমান চাষ পদ্ধতি এখন নতুন পথ দেখাচ্ছে। এই পদ্ধতিকে এখন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে এই চাষ পদ্ধতির আধুনিকায়ন করায় এখন তা বহুমুখী ফসল উৎপাদনে সক্ষমতা দিয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের কৃষিখাত ক্রমশ হুমকিতে পড়ছে। ঘন ঘন ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রতিবছর ফসলহানির ঘটনা ঘটছে। অপরদিকে কৃষিজমির অপব্যবহার, অপরিকল্পিত শহরায়ণের ফলে কৃষি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। এদিকে প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনসংখ্যা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে খাদ্যনিরাপত্তা পড়ছে হুমকিতে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষিক্ষেত্রের এমন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষিণাঞ্চলের ভাসমান চাষপদ্ধতি নতুন আশা দেখাচ্ছে।

বরিশালের কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, এচাষ পদ্ধতি হাওর ও দুর্যোগকবলিত স্থানে সম্প্রসারণ করা গেলে খাদ্যের গুণগত মান সুরক্ষা, কম জমিতে অধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। এরইমধ্যে তা সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরিশালের বেশ কয়েকটি এলাকায় কয়েকশ বছর ধরে এই চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করছেন কৃষকেরা। বছরের অধিকাংশ সময় জমি জলাবব্ধ থাকায় তাঁরা জীবিকার তাগিদেই এক সময় নিজেরা শুরু করেন এই ভাসমান পদ্ধতি। স্থানীয়ভাবে একে ‘ধাপ’ চাষ পদ্ধতি বলা হয়।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, পিরোজপুরের নাজিরপুর, স্বরূপকাঠি এবং সন্নিহিত গোপালগঞ্জ জেলার বিস্তৃত গ্রামে এই পদ্ধতিতে অন্তত আড়াইশ বছর ধরে চাষাবাদ করে আসছেন কৃষকেরা। দক্ষিণাঞ্চলের এই ভাসমান সবজি চাষ এরই মধ্যে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতির স্বীকৃতি পেয়েছে। এফএও ২০১৫ সালে এই স্বীকৃতি দেয়।
বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, উমারেরপাড় এলাকার চাষীরা জানান, বছরের সাত মাস এসব বিল জোয়ার-ভাটার পানিতে জলমগ্ন থাকে। তাই ফসল বোঁনা যায় না। কিন্তু এই বিপুল আয়তনের জমি পতিত থাকলে কৃষকেরা বাঁচবেন কীভাবে? এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় এই চাষ পদ্ধতির উদ্ভাবন করে ফেলেছিলেন তাঁদের পূর্ব পুরুষেরা। এখনও তাঁরা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। বরিশালের বানারীপাড়া, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর এবং সন্নিহিত পিরোজপুরের নাজিরপুর ও স্বরূপকাঠি উপজেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে এই পদ্ধতিতে সবজি এবং সবজি ও কাঠ, ফুলের চারা আবাদ করে চলেছেন।

উমারেরপাড় গ্রামের চাষী আবদুস সালাম (৩০) সাত বছর বয়স থেকে বাবা সিপন হাওলাদারের কাছ থেকে এই কাজে হাতে খড়ি। যেমন তাঁর বাবার হাতেখড়ি হয়েছিল দাদা রুস্তুম আলীর কাছ থেকে। পূর্বপুরুষদের এই চাষপদ্ধতি উদ্ভাবনকে নিজেদের আশির্বাদ মনে করছেন সালাম। বলেন, ‘তাঁরা এই পদ্ধতি উদ্ভাবন না করলে আমরা বাঁচতাম কীভাবে? আমাদের জমি একবার ধানচাষের পর সারা বছর পানিতে নিমজ্জিত থাকে’। সালামের এমন ২০ টি ভাসমান বেড রয়েছে। একেকটি ৬০ হাত লম্বা এবং প্রস্থে তিন হাত। ২০টি বেড তৈরি, আবাদ করতে তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এতে ৬০ হাজারের মত চারা উৎপাদন হবে। সব ব্যয় মিটিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার মতো লাভ হবে।
বানারীপাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, বানারীপাড়ায় ১০ বছর আগে ৮৫ হেক্টরে ভাসমান কৃষি চাষ হতো। এখন তা বেড়ে ১০০ হেক্টরে উন্নীত হয়েছে। একইভাবে উজিরপুরে ১০ বছরে ভাসমান কৃষি আবাদ বেড়ে হয়েছে ১৫০ হেক্টের।

ভাসমান কৃষি কেমন
ভাসমান কৃষি হলো দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্লাবিত বাস্তুতন্ত্রের জন্য স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবনী ফসল চাষব্যবস্থা। বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বন্যা ও বিল এলাকার কৃষকেরা অন্তত আড়াইশ বছর ধরে বন্যা ও জলমগ্ন থাকা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘মাটিবিহীন চাষাবাদের’ দেশীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছেন। বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও পিরোজপুরের বিলসমূহে এই ভাসমান চাষ হচ্ছে। ফসল চাষের জন্য টেপাপোনা, শেওলা, দুলালি লতা, নারিকেলের ছোবলা ও মাটি দিয়ে ভাসমান বিছানা (বেড) তৈরি করে তার ওপর বিভিন্ন ধরনের সবজি, মসলাজাতীয় ফসল আবাদ করা হয়।
আধুনিকায়ন গবেষণা
এই চাষ পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্যদিয়ে আধুনিকায়ন করে বরিশালের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) বিজ্ঞানীরা। ২০১২ সালে এই গবেষণা শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা জানান, এই গবেষণায় সফলতার পর তা দেশের ২৪টি জেলার ৪৬টি উপজেলায় এই চাষ পদ্ধতিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ এবং উপযুক্ত অনুশীলন হচ্ছে এই চাষপদ্ধতি। পদ্ধতিটি এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং প্লাবিত অবস্থায় সবজি ও মসলা চাষের একটি সফল উপায় হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে পদ্ধতিটি প্রমাণিত।

গবেষণায়, ভাসমান বেডে সবজি ও মসলাজাতীয় ফসলের মানসম্পন্ন চারার পাশাপাশি মাঠফসলের চারা উৎপাদন যেমন ভুট্টা ও সূর্যমুখী, অলতাজাতীয় গ্রীষ্ম ও শীতকালীন সবজি চাষের কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তির নাম দিয়েছেন ‘ভাসমান বিছানা কাম ট্রলিস’। তাঁরা প্লাবিত ও প্লাবনহীন মডেল (নন-টাইডাল ও টাইডাল) তৈরি করে লতাজাতীয় সবজির সঙ্গে লতাহীন সবজি, মসলা ফসলের আন্ত, মিশ্র, বদলি ফসলসহ অন্য ফল, সমন্বিত সবজি ও মাছ চাষ নিয়ে গবেষণা করেও সফলতা পান। গবেষকেরা এই প্রযুক্তির নাম দিয়েছেন, ‘ভাসমান ফসলের জন্য সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা’।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ভাসমান কৃষির আওতাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৫৫ হেক্টর। এই চাষ সম্প্রসারণে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
গবেষণা, সম্প্রসারণ এবং ভাসমান সবজি ও মসলা চাষ জনপ্রিয়করণ’ প্রকল্পটির বিজ্ঞানী ড. আলীমুর রহমান বলেন, কৃষকেরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় এই কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন। এর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করে সমন্বিত চাষের আওতায় আনতে পারলে উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি করা সম্ভব। এরই মধ্যে আমরা দীর্ঘ গবেষণা চালিয়ে এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উদ্ভাবন করে বেশ সফলতা পেয়েছি। শুধু শাকসবজি নয়; মসলা, লতাজাতীয় ফল, স্ট্রবেরিসহ অন্যান্য ফসলও সমন্বিতভাবে চাষ করে সফলতা এসেছে। এখন এসব প্রযুক্তি দক্ষিণাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

জলবায়ু-জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক
ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে ছিল। কারণ এটি বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। এদেশের ভূমির একটি বড় অংশ ঘন ঘন বন্যা, খরা, প্লাবনের সম্মুখীন হয়। প্রায়ই বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃষ্টিপাতের ধরণকেও ক্রমশ অনিশ্চিত তুলছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। বিশেষ করে দেশের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করে এবং তাঁদের প্রধান পেশা কৃষি।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (এফএও) ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রায় ৬৯ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৮৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের ভাসমান ফসল চাষের পদ্ধতি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। এ পদ্ধতিতে সারা বছরই ফসল উৎপাদন সম্ভব। ভাসমান চাষাবাদের পদ্ধতিতে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার হয় না বলে তা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য সহায়ক।
বিএম/মে/জ



