― Advertisement ―

কোটাবিরোধী আন্দোলন: সড়ক অবরোধ করে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৯...

গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগার এখন উইপোকা-ইঁদুরের বাসস্থান!

গৌরনদী প্রতিনিধি: বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের জ্ঞান আহরণের জন্য এক সময় সরব ছিল ‘গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগার। তবে সংরক্ষণের অভাবে এই পাঠাগারটি এখন নিজেই যেন স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি স্মরণে নির্মিত পাঠাগারটি এখন উইপোকা আর ইঁদুরের নিরাপদ বাসস্থান।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে ১৯৭৫ সালের ৭ মে গৌরনদী কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মসজিদের সম্মুখে পাঠাগারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পদাধিকার বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাঠাগারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব পালন করতেন সরকারী গৌরনদী কলেজের যেকোন একজন শিক্ষক। প্রতিদিন প্রায় ২শ থেকে ৩শ পাঠক এসে বই পড়তেন এই পাঠাগারে। এছাড়া প্রায় শতাধিক সদস্য নিবন্ধন করে বই পড়তে বাড়ি নিয়ে যেতেন।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, এক সময়ের সরব এই পাঠাগারে ছিল ছয় হাজার নিবন্ধিত বিভিন্ন ভাষার দুর্লভ বই ও প্রতিদিনের বাংলা-ইংরেজী এবং সাপ্তাহিক পত্রিকা। ছিল পরিচালনা কমিটি ও সহস্রাধিক আজীবন ও সাধারণ সদস্য। ছিল আটটি বৈদ্যুতিক ফ্যান, ১৫০টি চেয়ার ও ১৫টির মত বড় টেবিল। তিন কক্ষ বিশিষ্ট এই পাঠাগারটির দেখভাল করতেন একজন লাইব্রেরিয়ান, একজন সহকারী লাইব্রেরিয়ান ও একজন নাইটগার্ড। পাঠাগারের বৈদ্যুতিক বিল ও স্টাফ বেতন দেয়া হত সদস্যদের চাঁদা ও বিশিষ্টজনদের অনুদান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কর্যালয়ের বিশেষ অনুদানের মাধ্যমে।

সরকারীভাবে বাংলাদেশ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রতিবছর সাত হাজার টাকার বই দেয়া হত এই পাঠাগারে। তবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৮ সালে পাঠাগারটির রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় গৌরনদী পৌরসভা। আর তখন থেকে সদস্যদের চাঁদা থেকে বৈদ্যুতিক ও যাবতীয় খরচ এবং পৌরসভা থেকে বিশেষ বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমে পাঠাগারের স্টাফদের বেতন খরচ বহন করা হত।

গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাকালীন আজীবন সদস্য সাইদ বীন ভূঁইয়া (পান্নু) বলেন, ২০১১ সালে যখন হারিছুর রহমান প্রথম পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তখন পৌরসভার থেকে আসা পাঠাগারের জন্য বিশেষ বরাদ্দকৃত অর্থ বন্ধ করে দেন তিনি। এরপর থেকে স্টাফদের বেতন ও যাবতীয় খরচ বহনে হিমশিম খেতে হয়।

পরবর্তীতে যখন আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে তখন পাঠাগারের দায়িত্ব পৌরসভার বলে লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে চাবি নিয়ে যান হারিছুর রহমান। এছাড়া পাঠাগারটির কক্ষে গৌরনদী আওয়ামীলীগ কার্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনের রড, ইট, বালু সিমেন্ট রাখা এবং নির্মাণ শ্রমিকদের থাকতে দেয়া হয়।

শ্রমিক থাকার কারণে পাঠাগারে যত্রতত্র মানুষ অবাধে আনাগোনা শুরু করে। একপর্যায়ে দেখা যায় পাঠাগারের ছয় হাজার বইয়ের একটি বইও নেই। তাছাড়া এই সুযোগে কিছু মাদকসেবী ও ছিচকে চোর পাঠাগারের জানালার গ্রিল ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে পাঠাগারের বিভিন্ন আসবাবপত্র চুরি করে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। এরপরে মেয়র হারিছের ভয়ে কেউই পাঠাগারের কাছে যেতেও সাহস করেনি।

গৌরনদীর প্রবীন কবি ও লেখক সিকদার রেজাউল করিম জানান, প্রথমে এই পাঠাগারটির নাম গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগার হিসেবে নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে ক্ষমতার পালা বদলে এর নাম পরিবর্তন করে গৌরনদী পাবলিক লাইব্রেরী করা হলেও আবার পুনরায় এর নাম গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগার করা হয়। আমার নিজের চোখে দেখেছি বাংলা, ইংরেজী, আরবী, ফারসি ভাষার অনেক দুর্লভ গ্রন্থ ছিল এ জ্ঞান ভান্ডারে। পাঠাগারটির এই বর্তমান অবস্থার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবী জানান তিনি।

গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাকালীন আজীবন সদস্য ও গৌরনদী পৌর নাগরিক কমিটির সভাপতি সাংবাদিক জহুরুল ইসলাম জহির বলেন, পাকা ভবন হওয়ার পরে আরো জমাজমাট হয়ে উঠেছিল লাইব্রেরীটি। তখন লাইব্রেরীর পাঠক বা সদস্য হওয়া ছিল অনেকের কাছে গর্বের। লাইব্রেরীটি পাঠকদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে আত্মার খোরাক ছিল এবং তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক অবক্ষয় থেকে রক্ষার হাতিয়ার ছিল। লাইব্রেরীটি বন্ধ হওয়ার কারনে সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। গৌরনদী পাবলিক লাইব্রেরীটি (গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগার) পুনর্জ্জীবিত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু আবদুল্লাহ খান বলেন, গৌরনদী শহীদ স্মৃতি পাঠাগারটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি এটি একসময় খুবই প্রাণবন্ত ও জমাজমাট ছিল এবং অনেক দুর্লভ গ্রন্থও ছিল এখানে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি স্মরণে নির্মিত এই পাঠাগারটি সংরক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অচিরেই আমরা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।