চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি
মানুষ স্বভাবগত ভাবেই সুন্দরের পূজারী। চুলদাড়ি মানুষের সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তাই চুলদাড়ি নিয়ে যুগে যুগে মানুষের ভাবনার অন্ত নেই। এই কারণেই আমাদের মাঝে নরসুন্দরদের কদর ও প্রয়োজনীয়তা একটু বেশিই । তারা আমাদের কাছে নরসুন্দর বা নাপিত নামে পরিচিত। পিঁড়িতে বা খাটিয়ায় বসে নরসুন্দরের হাঁটুর নিচে মাথা পেতে চুলদাড়ি কাটার রীতি আবহমান কাল ধরে চলে আসলেও সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা গ্রামীণ ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।
তবে বিলীনের পথে থাকা গ্রামীণ সেই ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছেন লক্ষন চন্দ্র শীল (৭২) ও বলায় চন্দ্র শীল (৭০) । বাজারের ফুটপাতে বসে তারা কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের প্রায় ৫২বছর। চরফ্যাশন উপজেলার শশীভুষন (লেতরা) বাজারের ফুটপাতে পিঁড়িতে বসিয়ে তারা এখনো স্থানীয়দের চুলদাড়ি কাটেন, করান শেভও। যার আয় দিয়ে কোনো রকমে চলে তাদের সংসার। তাদের কাছে আসেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। এ কাজের জন্য লক্ষন চন্দ্র শীল ও বলায় চন্দ্র শীলদের কাছে প্রয়োজনীয় চিরুনি, কাপড়, ছোট আয়না, ক্ষুর, কাঁচি ও একটি টুল বা পিঁড়ি রয়েছে। উপজেলার এওয়াজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা এ দুই নরসুন্দর।

বলায় চন্দ্র শীল জানান, আগে মানুষজন পিঁড়িতে বসে খোলা আকাশের নিচে চুলদাড়ি কাটাতেন ও শেভ করতেন। সেই ঐতিহ্য ধরে রেখে গত ৫২ বছর ধরে বিভিন্ন হাটে গিয়ে ফুটপাতে পিঁড়িতে বসিয়ে মানুষের চুলদাড়ি কাটান।সময়ের পরিবর্তনের সাথে কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে তাদের চুল-দাড়ি কাটার দরও। এখন প্রতিজনের চুল কাটার জন্য ৩০ ও দাড়ি কাটার জন্য ২০ টাকা করে নেন তারা। এতে করে প্রতি হাটে তাদের আয় হয় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মতো। পেশার সাথে যুক্ত অর্ধশত বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর বাজারের চিত্র বদলে গেলেও, বদলাননি তারা। তার পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তার মত তার ছেলেরাও নরসুন্দর পেশায় যুক্ত থাকলেও, ফুটপাতে নয় কাজ করেন আধুনিক সেলুনে।
আরেক নরসুন্দর লক্ষন চন্দ্র শীল বলেন, আমাদের কাছে বিভিন্ন বয়সের লোকেরা এসে কেউ চুল কাটান, কেউ বা দাড়ি কাটেন। কাজ অনুযায়ি একেকজন দেন ২০ থেকে ৪০ টাকা করে। এভাবে প্রতি হাটে দেড় থেকে দুইশত টাকার মত আয় তাদের। আর এই আয়ের টাকা দিয়েই চলে কোনো রকমে চলে সংসার। আমার সংসারে তিন
ছেলে রয়েছেন।
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সেলুনে চুলদাড়ি কাটার ইচ্ছে আছে কিনা ? এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, পিঁড়িতে বসিয়ে কাজ করানোয় অভ্যস্ত তারা। এখন চাইলেই তা আর সম্ভব না। জীবনের বাকি দিন গুলোতে এভাবেই কাজ করে জীবনের ইতি টানতে চান। নরসুন্দর লক্ষন চন্দ্র শীলের কাছে চুল কাটাতে ও শেভ করতে আসা কয়েকজন জানান, এদের কাছে কম দামে চুল-দাড়ি কাটানো যায়। শেভ করতেও তারা কম টাকা নেয়। এজন্যই তাদের কাছে আসি। বাজারের সেলুনগুলোতে গেলে এক থেকে দেড়শত টাকা করে দিতে হয় চুল-দাড়ি ও শেভ করতে।
বলায় চন্দ্র শীলের কাছে আসা আরেক খদ্দের খোরশেদ আলম বেপারী বলেন, এরা ফুটপাতে বসে চুলদাড়ি কাটলেও সুন্দর ভাবে তারা কাজ করে দেয় এদের কাছে কম
খরচে চুল দাড়ি কাটানো যায়। এক সময় খোলা পরিবেশে বসেই চুল-দাড়ি কাটাতে হতো। কালের বিবর্তণে এখন আর এসব সচরাচর দেখা যায় না ।



