দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌর শহরে পারিবারিক কলহের জেরে এক চরম নৃশংসতার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার ভোরে অন্য ঘরে ঘুমাতে বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে কুলসুম আক্তার মিমি (৩০) নামে এক গৃহবধূকে শাবল দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেছেন তাঁর স্বামী। ফুলবাড়ী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘাতক স্বামী মানিক হোসেনকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই, ২০২৬) ভোর পৌনে ৪টার দিকে ফুলবাড়ী পৌর শহরের স্বজনপুকুর বুন্দিপাড়া এলাকায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত কুলসুম আক্তার মিমি ওই এলাকার বাসিন্দা মৃত আব্দুল কাশেমের মেয়ে। অন্যদিকে, গ্রেপ্তারকৃত ঘাতক স্বামী মানিক হোসেন পূর্ব গৌরীপাড়া গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে। বিয়ের পর থেকে মানিক কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান না থাকায় স্বজনপুকুরে তাঁর শ্বশুরবাড়িতেই ঘরজামাই হিসেবে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিলেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মানিক হোসেন দীর্ঘদিন ধরে কোনো কাজকর্ম না করায় পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব একাই সামলাতে হতো কুলসুমকে। বেকারত্ব ও আর্থিক অনটনের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকত। মঙ্গলবার ভোরে পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে কুলসুম তাঁর স্বামী মানিককে নিজের ঘর ছেড়ে অন্য একটি ঘরে গিয়ে ঘুমানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু মানিক স্ত্রীর ঘরেই একসাথে থাকার জন্য জোরজবরদস্তি শুরু করেন।
একপর্যায়ে কুলসুম আক্তার স্বামীকে পুনরায় ঘর থেকে বের হয়ে অন্য ঘরে চলে যেতে বললে মানিক চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি ঘরে থাকা মাটি খোঁড়ার ভারী লোহার শাবল (খন্দা) দিয়ে কুলসুমের মাথায় সজোরে উপর্যুপরি আঘাত করেন। লোহার শাবলের আঘাতে কুলসুমের মাথার খুলি ফেটে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘরের মেঝেতে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই নৃশংস ঘটনার সময় ঘরে থাকা তাদের সন্তানদের করুণ আর্তনাদ ও চিৎকার শুনে আশেপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ওই বাড়িতে ছুটে আসেন। তাঁরা রক্তাত্ব মৃতদেহ দেখতে পেয়ে ঘাতক মানিক হোসেনকে ঘর থেকে পালানোর সময় হাতেনাতে ধরে একটি ঘরে আটকে রাখেন। পরবর্তীতে থানায় খবর দেওয়া হলে ফুলবাড়ী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ উদ্ধার করে এবং মানিককে হেফাজতে নেয়।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের মা মেহেরুন নেছা বাদী হয়ে আজ সকালে ফুলবাড়ী থানায় মানিক হোসেনকে একমাত্র আসামি করে একটি সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মায়ের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী তাদের বড় ছেলে আল আমিন ডুকরে কেঁদে উঠে এই ঘটনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, “আমাদের চোখের সামনে বাবা মাকে শাবল দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলেছে। আমরা ঘাতক বাবার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।”
ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ শাহ ইত্তেফাককে জানান, খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের (Autopsy) জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতার এই স্পর্শকাতর মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দ্রুত আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।



