র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), যা দুই দশক আগে সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং সন্ত্রাস দমনের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে গঠন করা হয়েছিল, বর্তমানে নাম, পোশাক এবং কার্যক্রমে সংস্কারের পথে এগোচ্ছে। র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর, বাহিনীটির কার্যক্রম নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং নির্যাতনের অভিযোগে র্যাব একাধিকবার সমালোচিত হয়েছে। ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা বাহিনীর কার্যক্রমে আরও সন্দেহের সৃষ্টি করে।
র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান জানিয়েছেন, বাহিনীর নাম, লোগো এবং পোশাক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং একটি নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বাহিনীর কার্যক্রমের জন্য একটি আইনগত কাঠামো তৈরি করবে। বর্তমানে র্যাব পুলিশ অধ্যাদেশ অনুসারে পরিচালিত হলেও, নতুন আইনে এটি সংবিধান, ফৌজদারি আইন এবং মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিচালিত হবে।
তবে, র্যাবের সংস্কারের বিপরীতে অনেক মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবী বাহিনীর বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেছেন, “র্যাবের কার্যক্রমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং এনকাউন্টার বন্ধ হওয়া উচিত। তাদের কার্যক্রমের আর প্রয়োজন নেই।” মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনও বলেন, “র্যাবের কর্মকাণ্ড কল্পনারও বাইরে ছিল এবং তাদের কার্যক্রমের কারণে মানুষের মধ্যে ভয় এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।”
এদিকে, বাংলাদেশ সরকার একটি কমিশন গঠন করেছে, যা র্যাবের বিরুদ্ধে গুম এবং নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত ১,৬০০টি অভিযোগ জমা পড়েছে এবং এর মধ্যে ৪০০টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। কমিশন জানায়, তদন্তে র্যাবের একটি সেলে অমানবিক পরিবেশ ছিল, যেখানে কোনো আলো ছিল না এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল।
র্যাব বর্তমানে সারা দেশে ১৫টি ব্যাটালিয়ন পরিচালনা করছে, এবং বাহিনীটির কার্যক্রম পুলিশ অধ্যাদেশ অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে। তবে নতুন আইনের খসড়ায় বাহিনীর কার্যক্রমের শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। র্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২১ সালের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর থেকে বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে, র্যাব নানা অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, বাহিনীটি খুন ও ধর্ষণের অভিযোগে ১,৪৬০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে, ডাকাতির অভিযোগে ৬১৭ জনকে এবং ছিনতাইয়ের অভিযোগে ৬৮০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া, অপহরণ এবং প্রতারণার অভিযোগে ৫০০ জন এবং ২৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
র্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাহিনীটির বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে, অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে, র্যাবের কার্যক্রমের ব্যাপারে যথাযথ পরিবর্তন আনা না গেলে বাহিনীর ভবিষ্যত নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠতে পারে।



