নিজস্ব প্রতিবেদক
২০১৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবন দস্যুদের অভায়ারণ্য ছিল। এরপর দস্যু দমনের সূচনা হয়। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় দলের নাম ছিল ‘মাস্টার বাহিনী’। এই বড় দলটি যখন আত্মসমর্পণ করে আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেয়, তখন অন্যান্য ছোট দলগুলিও আত্মসমর্পণ এবং পুনর্বাসনে রাজি হয়।
তখন ৩২টি দস্যু দলের প্রধানসহ ৩২৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেন, জমা দেন ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গুলি। অবশেষে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে।

অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সুন্দরবনে আবারও শুরু হয় দস্যুদের উৎপাত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিস্ক্রিয়াতার সুজোগে দস্যুরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্তত ১৫টি দস্যু বাহিনী সুন্দরবনজুড়ে এখন সুক্রিয় রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় সুন্দরবনের ত্রাস ছিল ‘ইলিয়াস বাহিনী’, বঙ্গোপসাগর থেকে সুন্দরবনের গভীর পর্যন্ত ছিল এই বাহিনীর দাপট। ইলিয়াস আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তিনি ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন।
গত বছরের আগস্টে ইলিয়াসের বোনের স্বামী রবিউল নতুন দল গড়ে তোলেন। স্থানীয়রা এই দস্যুদলকে ‘দুলাভাই বাহিনী’ নামে চেনেন।
এই দুলাভাই বাহিনী সহ অন্তত ১৪টি দস্যুদল বর্তমানে সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে। তারা নিয়মিত অস্ত্রের মুখে বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। আগে যারা আত্মসমর্পণ করেছিলেন এমন অন্তত ১১ জন আবারও দস্যুতায় ফিরেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি দুলাভাই বাহিনী কয়রা এলাকার তরুণ এক জেলেকে অপহরণ করে। এরপর তাঁর স্বজনদের কাছে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে ছেলের লাশ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার হুমকি দেয় দস্যুরা। অবশেষে মুক্তিপণ দিয়ে ওই জেলেকে ফিরে পায় পরিবার।
জানা যায়, দস্যুদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন উপকূলের প্রভাবশালী একশ্রেণির মাছ ব্যবসায়ী, যাঁরা এলাকায় ‘কোম্পানি মহাজন’ নামে পরিচিত। তাঁদের নির্দেশে জেলেরা নদীতে বিষ ছিটিয়ে মাছ ধরেন। তাঁরাই দস্যুদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়ে দেন, প্রায় সময় মুক্তিপণও পাঠান। এতে দস্যুদের হাতে যায় টাকার জোগান, অস্ত্রের মজুত আর বিষে নষ্ট হয় সুন্দরবনের পরিবেশ।
এ বিষয়ে নাগরিক সংগঠন ‘উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলন’-এর সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নজরদারির অভাবে দস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ছোট দলগুলো বড় বাহিনীতে পরিণত হবে। বনজীবীদের জীবিকা, পর্যটন ও সরকারের রাজস্ব হুমকির মুখে পড়বে। দস্যুদের ভয়ে এ বছর মৌয়ালদের মধু আহরণ প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।
সুন্দরবন ঘেঁষা উপকূলীয় এলাকায় এখন জেলেরা দিনরাত বনদস্যুদের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। বলেশ্বর থেকে রায়মঙ্গল নদী জুড়ে এই ভয় ছড়িয়ে আছে। এমনকি দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা দুবলার চরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের পরিবার দুশ্চিন্তায় থাকেন।

এই প্রেক্ষাপটে ‘কোম্পানি মহাজন’ নামে পরিচিত বেশ কয়েকজন মাছ ও কাঁকড়া ব্যবসায়ী দস্যুদের সঙ্গে আঁতাত করে বনজুড়ে নিজেদের ব্যবসার বিস্তার করছেন। নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও বনদস্যুতার নেপথ্যে ওই মহাজনদের সক্রিয় ভূমিকা আছে। তবে বাইরের জগৎ এই ভয়াল বাস্তবতা জানে খুব কমই।
এ বিষয়ে বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেল ভেঙে পালানো কয়েদি এবং চিহ্নিত আসামিরাও যুক্ত হয়েছে এই দস্যুতা পেশায়। যেমন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি গ্রামের আবদুল্লাহ তরফদার (৪২) নারী পাচার মামলায় কারাগারে ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্ট রাতে সাতক্ষীরা জেলা কারাগার ভাঙচুর করা হলে সেখান থেকে পালিয়ে যান আবদুল্লাহ। পরে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বনদস্যুতায় নামেন। আবদুল্লাহর সঙ্গে ১০-১২ জনের একটি দল রয়েছে। তাঁদের অধিকাংশ কারাগার থেকে পালানো।
একজন নব্য ডাকাত নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অস্ত্রের দোকানে যাঁরা মেকানিক্যাল কাজ করেন, তাঁরা আসল বন্দুকের মতো বন্দুক বানাতে পারেন। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও মালামাল নিয়ে সরাসরি সুন্দরবনে এসে অস্ত্র তৈরি করে দিয়ে যায়।

কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে ১৮ জন দস্যুকে গ্রেপ্তার এবং ১৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২২৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ১২টি।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে সক্রিয় থাকা দস্যুদের দমন করতে নিয়মিত অভিযান চলছে। ইতিমধ্যে অপহৃত বহু জেলে ও বাওয়ালিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের তক্কাখালী এলাকায় সম্প্রতি বনদস্যুদের সঙ্গে বনরক্ষীদের গোলাগুলি হয়েছে। আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একসঙ্গে অভিযান চালাত, তাতে দ্রুত বনদস্যুদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যেত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।



