আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় আতিথেয়তা বিনিয়োগ বাজারে পরিণত হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিস্তার ও উন্নত বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই খাতে দেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের জেনারেল ম্যানেজার কার্তিক ভিকে।

ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশে প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এই হসপিটালিটি বিশেষজ্ঞের। আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস, দ্য ওবেরয় গ্রুপ ও ট্রাইডেন্ট হোটেলের মতো বিশ্বমানের ব্র্যান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। কার্তিক ভিকের মতে, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের মূল সমস্যা সম্পদের অভাব নয়, বরং এর সঠিক পজিশনিং বা ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত ও বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ কেবল একটি ব্যবসায়িক গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটিকে পরিবর্তন করে লেজার বা অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা জরুরি।

বিগত ৩০ বছরে বাংলাদেশের হোটেল ব্যবসা লেনদেনভিত্তিক থেকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক সেবায় রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কেবল সেবার মান বাড়ায়নি, বরং সুশাসন ও টেকসই পরিচালনায় নতুন মাত্রা এনেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার এ খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। তবে আগামীতে কেবল ঘরের সংখ্যা না বাড়িয়ে যারা অতিথিদের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা দিতে পারবে, তারাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব ঢাকাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক হোটেলগুলোতে পড়ছে বলে জানান তিনি। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির ফলে এয়ারলাইন ভাড়া ও হোটেল পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, যার ফলে বুকিংয়ের ক্ষেত্রে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজার ধরে রাখতে হোটেলগুলোকে কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে, ঢাকায় রুম ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ার পেছনে সীমিত অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বজায় রাখার উচ্চ পরিচালনা ব্যয়কে দায়ী করেন তিনি।
দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বাংলাদেশে মেধার কোনো ঘাটতি নেই, বরং সঠিক এক্সপোজারের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন কার্তিক ভিকে। হোটেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর যৌথ উদ্যোগে ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণ জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি পর্যটন খাতের দ্রুত বিকাশে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, হোটেল অবকাঠামোতে শুল্ক ছাড় দেওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করার সুপারিশ জানান এই খাত বিশেষজ্ঞ।
প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে তিনি বলেন, নতুন ফাইভ স্টার হোটেল এলে বাজারের প্রসার ঘটে এবং সেবার মান উন্নত হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর অন্ধ অনুকরণ না করে বাংলাদেশের নিজস্ব নদী, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার গল্প বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরাই হবে সফল পর্যটন শিল্পের মূল চাবিকাঠি। ২০২৬ সালটি হসপিটালিটি খাতের জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত প্রবৃদ্ধির বছর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ এ খাতে নেতৃত্ব দেবে।



